সিজারের পর ইনফেকশনের কারণ কী? জানুন মানহীন ক্লিনিক, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও ক্ষতস্থানের অযত্নসহ প্রধান কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়।
বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার গত এক দশকে অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) অনুযায়ী এখন প্রায় প্রতি দুইজন মায়ের একজনের সন্তান জন্ম হচ্ছে সিজারে। বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে এই হার আরও বেশি।
সিজার একটি বড় অস্ত্রোপচার, তাই এর পরে ইনফেকশনের ঝুঁকি থাকে। সঠিক যত্ন ও সচেতনতা থাকলে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। এই লেখায় সিজারের পর ইনফেকশনের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিয়ে সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।
সিজারের পর ইনফেকশন কী?
সিজারের সময় তলপেটের চামড়া, চর্বির স্তর, পেশির আবরণ ও জরায়ু কাটা হয়। এই কাটা জায়গায় জীবাণু ঢুকে বংশবৃদ্ধি করলে তাকে সার্জিক্যাল সাইট ইনফেকশন (SSI) বলে।
ইনফেকশন তিনটি জায়গায় হতে পারে:
- ক্ষতস্থানে (ঘা): সেলাইয়ের জায়গা লাল হওয়া, ফুলে যাওয়া, পুঁজ বের হওয়া।
- জরায়ুতে: একে এন্ডোমেট্রাইটিস বলে। এতে জ্বর ও তলপেটে ব্যথা হয়।
- মূত্রনালিতে (ইউরিন ইনফেকশন): ক্যাথেটার ব্যবহারের কারণে হতে পারে।
সাধারণত অপারেশনের ৩ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে এসব সমস্যা দেখা দেয়।
সিজারের পর ইনফেকশনের প্রধান কারণ
অপারেশন থিয়েটারে জীবাণুমুক্ত পরিবেশের অভাব
ইনফেকশনের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ও যন্ত্রপাতি পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত না থাকা।
অস্ত্রোপচারের যন্ত্র যথাযথভাবে স্টেরিলাইজ না করা, ওটিতে অতিরিক্ত লোকজনের যাতায়াত এবং চিকিৎসকের হাত ও গ্লাভস ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত না থাকলে জীবাণু ক্ষতে ঢুকে যেতে পারে।
অননুমোদিত ও মানহীন ক্লিনিকে সিজার
বাংলাদেশে বিশেষ করে শহরের অলিগলি ও উপজেলা পর্যায়ে এমন কিছু ক্লিনিক আছে, যেগুলোর লাইসেন্স নেই বা ন্যূনতম মান নেই। দালালের মাধ্যমে রোগী নেওয়া এবং অদক্ষ জনবল দিয়ে অপারেশন করানোর অভিযোগও শোনা যায়।
এসব জায়গায় নিয়মিত জীবাণুমুক্তকরণ, পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল ও প্রশিক্ষিত নার্সের অভাবে ইনফেকশনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
অপ্রয়োজনীয় সিজার
অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ থাকলেও নানা কারণে সিজার করানো হয়। যেমন ব্যথার ভয়, “শুভ সময়ে” সন্তান জন্ম দেওয়ার ইচ্ছা বা ক্লিনিকের আর্থিক স্বার্থ।
চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া সিজার করালে মা অকারণে অস্ত্রোপচারের সব ঝুঁকির মধ্যে পড়েন, ইনফেকশনও তার একটি।
অস্ত্রোপচারের আগে অ্যান্টিবায়োটিক না দেওয়া বা ভুলভাবে দেওয়া
আন্তর্জাতিক নির্দেশনা বলে, সিজারের ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে ইনফেকশনের ঝুঁকি কমে। ভুল সময়ে দিলে বা না দিলে সেই সুরক্ষা পাওয়া যায় না।
উল্টো দিকে, নিজে নিজে বা ফার্মেসির পরামর্শে ভুল অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রবণতাও সমস্যা তৈরি করে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার একটি পরিচিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এর ফলে অনেক জীবাণু সাধারণ ওষুধে আর সাড়া দেয় না। তাই ইনফেকশন হলে চিকিৎসা কঠিন হয় এবং সুস্থ হতে বেশি সময় লাগে।
ক্ষতস্থানের অপর্যাপ্ত যত্ন
অপারেশনের পর বাসায় ফিরে ক্ষতস্থান ভেজা বা নোংরা থাকলে, নিয়মিত ড্রেসিং না বদলালে বা নোংরা হাতে ক্ষত ছুঁলে ইনফেকশন হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় ঘরোয়া টোটকা, যেমন ক্ষতে হলুদ, তেল বা পাউডার লাগানো হয়।
এতে ইনফেকশনের ঝুঁকি আরও বাড়ে।
প্রসবের আগে দীর্ঘ সময় পানি ভাঙা বা দীর্ঘ প্রসববেদনা
পানি ভাঙার পর অনেকক্ষণ সময় পার হয়ে গেলে বা বহু ঘণ্টা ব্যথা সহ্য করার পর জরুরি সিজার করলে জরায়ুতে আগে থেকেই জীবাণু ঢুকে যেতে পারে। বাড়িতে বা অদক্ষ দাই-এর কাছে প্রসবের চেষ্টা করে পরে হাসপাতালে আনা রোগীর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি।
খালি পেটে সিগারেট খেলে কি হয়? জেনে নিন ভয়ংকর ক্ষতির কথা
কোন মায়েদের ঝুঁকি বেশি?
কিছু অবস্থায় সিজারের পর ইনফেকশনের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকে:
- ডায়াবেটিস আছে এমন মা (বাংলাদেশে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসও বেশ দেখা যায়)
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- রক্তস্বল্পতা বা অপুষ্টি
- ধূমপান বা জর্দা-গুল জাতীয় তামাক ব্যবহার
- আগে থেকে যোনিপথ বা মূত্রনালিতে ইনফেকশন থাকা
- জরুরি অবস্থায় করা সিজার
- অপারেশন দীর্ঘ সময় ধরে চলা বা বেশি রক্তক্ষরণ হওয়া
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা
ইনফেকশনের লক্ষণ চিনুন
নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান:
- ১০০.৪°F (৩৮°C) বা তার বেশি জ্বর
- সেলাইয়ের জায়গা লাল, গরম, ফোলা বা অতিরিক্ত ব্যথাযুক্ত হওয়া
- ক্ষত থেকে পুঁজ, দুর্গন্ধযুক্ত তরল বা রক্ত বের হওয়া
- ক্ষত খুলে যাওয়া
- তলপেটে তীব্র ব্যথা
- যোনিপথ দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব
- প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা ঘন ঘন প্রস্রাব
- অতিরিক্ত দুর্বলতা, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর

সিজারের পর ইনফেকশন প্রতিরোধের উপায়
অপারেশনের আগে
- সিজারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন অভিজ্ঞ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় মতামত নিতে দ্বিধা করবেন না।
- হাসপাতাল বা ক্লিনিকটির স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধন আছে কি না, তা যাচাই করুন। দালালের কথায় ক্লিনিক বেছে নেবেন না।
- গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা, ডায়াবেটিস ও মূত্রনালির ইনফেকশন থাকলে আগে থেকেই চিকিৎসা করান।
- অপারেশনের আগে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে কি না, চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন।
অপারেশনের পর হাসপাতালে
- সেবাদানকারী ও আপনার সঙ্গে থাকা স্বজনেরা ক্ষত বা নবজাতককে ছোঁয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোবেন।
- ক্যাথেটার প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় রাখা হচ্ছে কি না খেয়াল রাখুন।
- হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় দর্শনার্থীর ভিড় এড়ান।
বাসায় ফিরে
- ক্ষতস্থান শুকনো ও পরিষ্কার রাখুন। ডাক্তারের নির্দেশমতো ড্রেসিং বদলান।
- ক্ষতে হলুদ, তেল, পাউডার বা কোনো ঘরোয়া প্রলেপ লাগাবেন না।
- চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক ও ওষুধ পুরো কোর্স শেষ করুন। ভালো লাগছে বলে মাঝপথে বন্ধ করবেন না।
- পুষ্টিকর খাবার খান। ডাল, ডিম, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও ফল ক্ষত শুকাতে সাহায্য করে।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন ও বিশ্রাম নিন।
- ভারী জিনিস তোলা বা অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
- প্রসবোত্তর ব্যবহারের প্যাড ও অন্তর্বাস পরিষ্কার রাখুন এবং নিয়মিত বদলান।
- নির্ধারিত ফলো-আপ ভিজিটে অবশ্যই যান।
ইনফেকশন হলে কী চিকিৎসা হয়?
ইনফেকশনের ধরন ও তীব্রতার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে:
- হালকা ক্ষতের ইনফেকশনে: ক্ষত পরিষ্কার করা ও খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
- পুঁজ জমলে: ছোট অস্ত্রোপচারে পুঁজ বের করে ক্ষত খোলা রেখে ড্রেসিং করা হয়।
- জরায়ুর ইনফেকশনে: সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি রেখে শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
- গুরুতর অবস্থায়: রক্ত ও পুঁজের কালচার পরীক্ষা করে সংবেদনশীল অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করা হয়।
নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া বা ফার্মেসির পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক চালানো বিপজ্জনক। এতে ইনফেকশন চাপা পড়ে গিয়ে পরে আরও জটিল আকার নিতে পারে।
চিকিৎসা না করালে কী ঝুঁকি?
ইনফেকশনের চিকিৎসা দেরি করলে বা অবহেলা করলে এসব জটিলতা হতে পারে:
- ক্ষত খুলে যাওয়া বা দীর্ঘদিন না শুকানো
- পেটের ভেতর পুঁজ জমা
- রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস), যা প্রাণঘাতী হতে পারে
- ভবিষ্যতে গর্ভধারণে জটিলতা
- দীর্ঘমেয়াদি পেটব্যথা
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১ঃ সিজারের কত দিন পর্যন্ত ইনফেকশনের ঝুঁকি থাকে?
সাধারণত প্রথম এক মাসের মধ্যে ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে কিছু ক্ষেত্রে আরও পরে লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
২ঃ সিজারের সেলাই কতদিনে শুকায়?
সাধারণত ১ থেকে ২ সপ্তাহে ক্ষতের বাইরের অংশ শুকিয়ে আসে। ভেতরের অংশ পুরোপুরি সেরে উঠতে কয়েক সপ্তাহ লাগে।
৩ঃ সিজারের পর গোসল করা যাবে?
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করতে হবে। সাধারণত ক্ষত ভিজে গেলে আলতো করে শুকনো কাপড়ে মুছে ফেলতে হয়।
৪ঃ সিজারের পর কি সব সময় অ্যান্টিবায়োটিক লাগে?
চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে দেন। কোনো ওষুধ নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করবেন না।
সিজারের পর ইনফেকশনের কারণগুলো মূলত নির্ভর করে অপারেশনের পরিবেশ, চিকিৎসার মান, মায়ের স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং অপারেশনের পরের যত্নের ওপর।
বাংলাদেশে মানহীন ক্লিনিক, অপ্রয়োজনীয় সিজার, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও ঘরোয়া টোটকার প্রবণতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।সচেতন থাকলে এ ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো যায়।
তাই নিবন্ধিত ও মানসম্পন্ন হাসপাতাল বেছে নিন, চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলুন, ক্ষতস্থান পরিষ্কার রাখুন এবং কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
আরও জানুন…
