শিশুর সরকারি টিকার তালিকা জানুন। বাংলাদেশের ইপিআই অনুযায়ী জন্ম থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত কখন কোন টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়, এক নজরে দেখুন।
নতুন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তাগুলোর একটি হলো শিশুর টিকা। কোন টিকা কখন দিতে হবে, কোথায় পাওয়া যাবে এবং কোনোটা ছুটে গেলে কী করতে হবে, এসব নিয়ে প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক।
সুখবর হলো, বাংলাদেশ সরকার সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে টিকা দিয়ে থাকে। এই লেখায় শিশুর সরকারি টিকার তালিকা ও সময়সূচি ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
ইপিআই কী এবং বাংলাদেশে এর গুরুত্ব কতটা
ইপিআই (Expanded Programme on Immunization) বা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বাংলাদেশে শুরু হয় ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল। শুরুতে ছোট পরিসরে আটটি থানায় পরীক্ষামূলকভাবে কর্মসূচিটি চালু হয়েছিল।
আজ এটি দেশের সবচেয়ে সফল জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমগুলোর একটি। clh-immunisation-bd
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচি শুরুর পর পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হার ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮১.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ইপিআই প্রতি বছর আনুমানিক ৯৪ হাজার শিশুর প্রাণ বাঁচাচ্ছে এবং ৫০ লাখ শিশুকে অসুস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করছে।
তবে একই প্রতিবেদন বলছে, প্রায় ৪ লাখ শিশু এখনো পুরোপুরি টিকা পায়নি।
তাই আপনার শিশুর টিকা সময়মতো নিশ্চিত করা জরুরি। unicefunicef

শিশুর সরকারি টিকার তালিকা ও সময়সূচি
ইপিআই সূচি অনুযায়ী শিশুকে জন্মের পর থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে প্রধান টিকাগুলো দেওয়া হয়।
সূচিতে আছে জন্মের সময় বিসিজি, ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি ও পিসিভি, ৬ ও ১৪ সপ্তাহে আইপিভি এবং ৯ ও ১৫ মাসে এমআর।
| শিশুর বয়স | টিকার নাম |
| জন্মের পর (যত দ্রুত সম্ভব) | বিসিজি |
| ৬ সপ্তাহ | পেন্টাভ্যালেন্ট-১, ওপিভি-১, পিসিভি-১, আইপিভি-১ |
| ১০ সপ্তাহ | পেন্টাভ্যালেন্ট-২, ওপিভি-২, পিসিভি-২ |
| ১৪ সপ্তাহ | পেন্টাভ্যালেন্ট-৩, ওপিভি-৩, পিসিভি-৩, আইপিভি-২ |
| ৯ মাস | এমআর-১ (হাম ও রুবেলা) |
| ১৫ মাস | এমআর-২ (হাম ও রুবেলা) |
এখন প্রতিটি টিকা আলাদাভাবে দেখা যাক।
শিশুর টিকা দিলে জ্বর আসে কেন?
বিসিজি (জন্মের সময়)
বিসিজি টিকা শিশুকে মারাত্মক ধরনের যক্ষ্মা, বিশেষ করে মেনিনজাইটিস ও ছড়িয়ে পড়া যক্ষ্মা থেকে রক্ষা করে।
চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেন, জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব এবং সবচেয়ে ভালো হয় দুই সপ্তাহের মধ্যে এটি দিতে।
সাধারণত ডান বাহুর উপরের অংশে চামড়ার ভেতরে এই টিকা দেওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ পর সেখানে ছোট ফুসকুড়ি বা দাগ হতে পারে। এটি স্বাভাবিক, ভয়ের কিছু নেই।
পেন্টাভ্যালেন্ট (৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ)
একটি টিকাতেই পাঁচটি রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা মেলে। রোগগুলো হলো ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি এবং হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (Hib)।
এ কারণে শিশুকে বারবার সুই ফোটাতে হয় না।
তিন ডোজ সম্পূর্ণ করা জরুরি, কারণ অসম্পূর্ণ ডোজে পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না।
ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন বা ওপিভি (৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ)
ফোঁটা হিসেবে মুখে খাওয়ানো এই টিকা পোলিও বা পোলিওমাইলাইটিস প্রতিরোধ করে।
বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত দেশ হিসেবে স্বীকৃত। তবে সীমান্তের ওপারে ঝুঁকি থাকায় এই সুরক্ষা ধরে রাখতে প্রতিটি শিশুকে ডোজ দিতে হবে।
নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন বা পিসিভি (৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ)
পিসিভি নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস ও রক্তের সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া, তাই এই টিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ইনঅ্যাকটিভেটেড পোলিও ভ্যাকসিন বা আইপিভি (৬ ও ১৪ সপ্তাহ)
এটি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া পোলিও টিকা। এতে ওপিভির সুরক্ষা আরও শক্ত হয়। ইপিআইয়ে সাধারণত কম মাত্রার (fractional) ডোজ ত্বকের ভেতরে দেওয়া হয়, তাই ইনজেকশনের জায়গাটি অনেক সময় ছোট ফোলা মতো দেখায়। এটি স্বাভাবিক।
এমআর বা হাম-রুবেলা (৯ ও ১৫ মাস)
হাম খুবই সংক্রামক রোগ। এর জটিলতায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্কের সংক্রমণ হতে পারে।
রুবেলা গর্ভবতী নারীর জন্য বিপজ্জনক, কারণ এতে গর্ভের শিশুর জন্মগত ত্রুটি হতে পারে। এমআর টিকা দুটি রোগের বিরুদ্ধেই কাজ করে।
৯ মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দিলে সুরক্ষা পূর্ণ হয়।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে এসেছে, টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের জন্য দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন চলছে এবং এতে ৩৪ লাখ শিশু টিকা পাবে। আপনার এলাকার ক্যাম্পেইনের তারিখ ও বয়সসীমা স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে জেনে নিন।
অন্যান্য সরকারি টিকা কার্যক্রম
নিয়মিত সূচির বাইরেও সরকার সময়ে সময়ে বিশেষ কর্মসূচি নেয়।
এইচপিভি (HPV) টিকা: জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে ২০২৩ সাল থেকে গ্যাভির সহায়তায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৭০ লাখের বেশি মেয়েকে এক ডোজের এইচপিভি টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টাইফয়েড (টিসিভি) টিকা: ৯ মাস বয়সী শিশু থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বয়সীদের জন্য টাইফয়েড প্রতিরোধে টিসিভি ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনার কথা ২০২৫ সালে জানানো হয়েছিল। আপনার এলাকায় এটি চলছে কি না, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে জেনে নিন।
মায়েদের জন্য Td টিকা: ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের জন্য ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া প্রতিরোধী Td টিকা দেওয়া হয়। গর্ভাবস্থায় এটি নেওয়া মা ও নবজাতক দুজনের জন্যই নিরাপত্তা দেয়।
রোটাভাইরাস টিকার বিষয়ে একটি কথা মনে রাখুন। বিশেষজ্ঞেরা এটি ইপিআই সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। আমি এটি নিয়মিত সরকারি সূচিতে যুক্ত হয়েছে এমন নিশ্চিত তথ্য পাইনি।
তাই এটি দেওয়ার আগে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে হালনাগাদ তথ্য জেনে নিন। বেসরকারি হাসপাতালে এটি অতিরিক্ত টিকা হিসেবে পাওয়া যায়, তবে তা সরকারি সূচির বাইরে এবং সাধারণত খরচ দিতে হয়।
শিশুকে টিকা দেওয়ার জন্য কোথায় যাবেন
- ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক
- উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতাল
- সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র (শহর এলাকায়)
- মাতৃ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র
গ্রামে সাধারণত নির্দিষ্ট দিনে স্যাটেলাইট ক্লিনিক বসে। আপনার এলাকায় টিকাদানের দিন কবে, তা স্থানীয় স্বাস্থ্য সহকারী বা পরিবার কল্যাণ সহকারীর কাছে জানতে পারবেন।
নিবন্ধনের জন্য সরকারের ডিজিটাল টিকা নিবন্ধন ব্যবস্থা সুরক্ষা (Surokkha) অ্যাপ বা ওয়েবসাইট কাজে লাগাতে পারেন। জন্মনিবন্ধন সনদ এবং শিশুর টিকা কার্ড সঙ্গে রাখুন।
টিকা দেওয়ার আগে ও পরে কী করবেন
টিকার আগে:
- শিশুর টিকা কার্ড সঙ্গে নিন এবং আগের ডোজের তারিখ মিলিয়ে নিন।
- শিশু যদি খুব অসুস্থ থাকে বা তীব্র জ্বর থাকে, স্বাস্থ্যকর্মীকে জানান।
- কোনো ওষুধ বা টিকায় আগে অ্যালার্জি হয়ে থাকলে অবশ্যই বলুন।
টিকার পরে:
- জ্বর, ইনজেকশনের জায়গা ফুলে যাওয়া বা ব্যথা, খিটখিটে ভাব সাধারণ। এগুলো সাধারণত এক-দুই দিনে ঠিক হয়ে যায়।
- শিশুকে বুকের দুধ বা পর্যাপ্ত তরল খাওয়াতে থাকুন।
- তীব্র জ্বর, অনবরত কান্না, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
- টিকা কার্ডে পরবর্তী ডোজের তারিখ লিখিয়ে নিন।
টিকা ছুটে গেলে কী করবেন
কোনো কারণে টিকা সময়মতো না দিতে পারলে প্রথম থেকে শুরু করতে হয় না। দ্রুত নিকটস্থ কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন, স্বাস্থ্যকর্মী বাকি ডোজগুলোর নতুন সময় ঠিক করে দেবেন। দেরি হলেও না নেওয়ার চেয়ে টিকা নেওয়া অনেক ভালো।
তবে একটি টিকার সময় ছুটে গেলে সবগুলো আবার শুরু করার দরকার নেই, শুধু বাকি ডোজ পূর্ণ করতে হবে। এর সুনির্দিষ্ট ব্যবধান স্বাস্থ্যকর্মীই বলে দেবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
সরকারি টিকা কি সত্যিই বিনামূল্যে?
হ্যাঁ, ইপিআইয়ের সব নিয়মিত টিকা সরকারি কেন্দ্রে বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
শিশুর টিকার কার্ড হারিয়ে গেলে কী করবেন?
যে কেন্দ্রে টিকা নিয়েছেন সেখানে যোগাযোগ করুন। তাদের রেজিস্টারে তথ্য থাকে, সেখান থেকে নতুন কার্ড বা তথ্য পাওয়া যাবে।
জন্মের পর হেপাটাইটিস বি-র আলাদা টিকা কি সরকারি সূচিতে আছে?
ইপিআইয়ে হেপাটাইটিস বি পেন্টাভ্যালেন্টের মধ্যেই দেওয়া হয়। জন্মকালীন আলাদা ডোজ নিয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছে হালনাগাদ তথ্য জেনে নিন।
মেয়ে ও ছেলে শিশুর টিকার সূচি কি আলাদা?
না, ইপিআইয়ের শিশুকালীন সূচি ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্য এক।
শিশুর সরকারি টিকার তালিকা মেনে চলা মানে শুধু একটি কার্ড পূরণ করা নয়, এটি শিশুর পুরো জীবনের জন্য সুরক্ষা তৈরি করা।
জন্মের সময় বিসিজি, ৬-১০-১৪ সপ্তাহে পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি ও পিসিভি, ৬ ও ১৪ সপ্তাহে আইপিভি এবং ৯ ও ১৫ মাসে এমআর, এই সূচিটি মনে রাখলেই প্রধান টিকাগুলো আপনি নিশ্চিত করতে পারবেন। কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ থাকলে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
সতর্কতা: এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। টিকার সূচিতে হালনাগাদ পরিবর্তন হতে পারে, তাই ডোজ দেওয়ার আগে নিকটস্থ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।
আরও দেখুন…
