রোগ ও প্রতিকার

নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন হলে করণীয়: জেনে নিন

নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন হলে করণীয়: জেনে নিন

নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন হলে করণীয় কী? ইনফেকশনের লক্ষণ, কোন ভুলগুলো এড়ানো উচিত এবং কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, তা জেনে নিন।

নাকফুল বা নোজ পিন পরা বাংলাদেশের মেয়েদের কাছে সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য দুটোরই অংশ। বিয়ে, ঈদ বা অন্য কোনো উৎসব উপলক্ষে অনেকেই নাক ফোঁড়ান। কিন্তু সঠিক নিয়মে না করলে বা ঠিকমতো যত্ন না নিলে ফোঁড়ানো জায়গায় ইনফেকশন হতে পারে।

 তখন ব্যথা, ফোলা ও পুঁজ হয়ে বিরক্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই লেখায় নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন হলে করণীয় কী, কীভাবে বুঝবেন ইনফেকশন হয়েছে এবং কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, তা সহজ ভাষায় বলা হলো।

নাক ফোঁড়ানোর পর কতদিন লাল ও ব্যথা থাকা স্বাভাবিক?

ইনফেকশন নিয়ে ভয় পাওয়ার আগে জানা দরকার, কোনটা স্বাভাবিক। নাক ফোঁড়ানোর পর প্রথম কয়েক দিন নিচের লক্ষণগুলো স্বাভাবিক:

  • ফোঁড়ানো জায়গায় হালকা লালচে ভাব
  • সামান্য ফোলা ও ছোঁয়ালে হালকা ব্যথা
  • হালকা সাদা বা হলদেটে তরল জমে শুকিয়ে যাওয়া। এটা শরীরের স্বাভাবিক নিরাময় প্রক্রিয়ার অংশ, পুঁজ নয়।

সাধারণত নাকের পাশের অংশ সেরে উঠতে ২ থেকে ৪ মাস এবং নাকের মাঝের অংশ বা কার্টিলেজে ৬ মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। তাই শুরুর দিকে হালকা অস্বস্তি হলে ঘাবড়াবেন না।

নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশনের লক্ষণ

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে ইনফেকশন হয়েছে বা হতে চলেছে:

  • ফোঁড়ানো জায়গা ও আশপাশে ক্রমাগত বাড়তে থাকা লালচে ভাব
  • দিন দিন বাড়তে থাকা ব্যথা বা দপদপ করা
  • ফুলে শক্ত হয়ে যাওয়া এবং জায়গাটা গরম লাগা
  • হলুদ, সবুজ বা দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হওয়া
  • নাকফুলের চারপাশে ফুসকুড়ি বা ফোঁড়ার মতো হওয়া
  • জ্বর, কাঁপুনি বা শরীর খারাপ লাগা

কয়েক দিনের বেশি এসব লক্ষণ থাকলে বা বাড়তে থাকলে দেরি না করে ব্যবস্থা নিন।

নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন কেন হয়?

বাংলাদেশে নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশনের কিছু সাধারণ কারণ আছে:

অপরিষ্কার যন্ত্রে ফোঁড়ানো: অনেকে পাড়ার গয়নার দোকান বা অদক্ষ কারও কাছে নাক ফোঁড়ান। জীবাণুমুক্ত না করা সুই বা পিয়ার্সিং গান ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়া ঢুকে যেতে পারে। পিয়ার্সিং গান নাকের কার্টিলেজের জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়।

নিম্নমানের গয়না: সস্তা ধাতু বা মেশানো সোনা ও রুপার নাকফুলে অনেকের অ্যালার্জি হয়, যা পরে ইনফেকশনে রূপ নিতে পারে। সার্জিক্যাল স্টিল, টাইটানিয়াম বা ১৪-১৮ ক্যারেট খাঁটি সোনা তুলনামূলক নিরাপদ।

নোংরা হাতে ছোঁয়া: ফোঁড়ানো জায়গায় বারবার হাত দেওয়া, ঘোরানো বা টানাটানি করা ইনফেকশনের বড় কারণ।

ধুলাবালি, ঘাম ও গরম আবহাওয়া: আমাদের দেশের আর্দ্র আবহাওয়া, ঘাম ও শহরের ধুলোবালি জীবাণু জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

ভুল ঘরোয়া টোটকা: নিজে নিজে হলুদ, টুথপেস্ট বা অন্য কিছু লাগালে হিতে বিপরীত হতে পারে।

চোখে রক্ত জমাট দূর করার ঘরোয়া উপায়

নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন হলে করণীয়: ঘরোয়া যত্ন

ইনফেকশন একেবারে শুরুর দিকে এবং হালকা হলে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন। তবে লক্ষণ গুরুতর হলে সরাসরি ডাক্তারের কাছে যাওয়াই ভালো।

আগে হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করুন

ফোঁড়ানো জায়গা ছোঁয়ার আগে সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুয়ে নিন এবং পরিষ্কার তোয়ালে বা টিস্যুতে মুছুন।

লবণ-পানির সেঁক দিন

এটি সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর ঘরোয়া পদ্ধতি।

  • এক কাপ (প্রায় ২৪০ মিলি) ফোটানো ও ঠান্ডা করা কুসুম গরম পানিতে আধা চা-চামচ সাধারণ লবণ মেশান।
  • পরিষ্কার তুলা বা গজ এই পানিতে ভিজিয়ে ফোঁড়ানো জায়গায় ৫ থেকে ১০ মিনিট চেপে ধরুন।
  • দিনে ২ থেকে ৩ বার এটি করুন।
  • শেষে পরিষ্কার শুকনো টিস্যু দিয়ে আলতো করে চেপে মুছুন, ঘষবেন না।

ফার্মেসিতে পাওয়া জীবাণুমুক্ত স্যালাইন (নরমাল স্যালাইন) স্প্রে বা দ্রবণও ব্যবহার করা যায়।

নাকফুল খুলবেন না

অনেকে ভাবেন নাকফুল খুলে ফেললে ইনফেকশন সেরে যাবে। কিন্তু ফোঁড়ানো ছিদ্র বন্ধ হয়ে গেলে ভেতরে পুঁজ আটকে ফোড়া (abscess) তৈরি হতে পারে। তাই নিজে থেকে খোলা উচিত নয়। খুলতে হবে কি না, সেটা চিকিৎসকের পরামর্শে ঠিক করুন।

হালকা ও আরামদায়ক গয়না রাখুন

ভারী বা বড় নাকফুল চাপ দেয় ও ঘষা লাগে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া গয়না না বদলে যতটা সম্ভব ঘষা ও টানাটানি এড়িয়ে চলুন।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন

  • পরিষ্কার তোয়ালে ও বালিশের কভার ব্যবহার করুন।
  • মুখ ধোয়ার সময় ফোঁড়ানো জায়গায় কড়া সাবান বা ফেসওয়াশ লাগাবেন না।
  • মেকআপ, ক্রিম বা পাউডার ওই জায়গা থেকে দূরে রাখুন।
নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন হলে করণীয়

এই ভুলগুলো একদম করবেন না

নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন হলে অনেকেই কিছু ভুল করেন, যা সমস্যা আরও বাড়ায়:

  • ডেটল, স্যাভলন, স্পিরিট বা হাইড্রোজেন পারক্সাইড লাগানো: এগুলো কড়া। এতে সুস্থ কোষও নষ্ট হয় এবং সারতে দেরি হয়।
  • হলুদ, টুথপেস্ট, নারকেল তেল বা অন্য টোটকা লাগানো: এতে জীবাণু বাড়তে পারে এবং ছিদ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
  • পুঁজ চেপে বের করা: এতে ইনফেকশন আরও ছড়িয়ে যেতে পারে।
  • নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া: ফার্মেসি থেকে নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া বা মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা। এতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক নেবেন না।
  • নাকফুল বারবার ঘোরানো বা টানা: এতে নতুন তৈরি হওয়া টিস্যু ছিঁড়ে যায়।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো অবস্থায় দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন:

  • ২ থেকে ৩ দিন ঘরোয়া যত্নের পরও উন্নতি না হলে
  • প্রচুর পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বের হলে
  • লালচে ভাব নাক ছাড়িয়ে গালে বা মুখের অন্য অংশে ছড়ালে
  • জ্বর, কাঁপুনি বা মাথাব্যথা হলে
  • নাকফুলের পেছনের দিকটা ফোলা টিস্যুর ভেতরে ঢুকে গেলে
  • নাকের কার্টিলেজে (মাঝের শক্ত অংশে) ইনফেকশন হলে। এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ কার্টিলেজে রক্ত চলাচল কম এবং সংক্রমণ সহজে সারে না, এমনকি নাকের আকৃতি নষ্ট হতে পারে।
  • ডায়াবেটিস বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে

নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞ অথবা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ বিভাগীয় শহরগুলোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতালে ইএনটি ও চর্ম বিভাগ আছে। সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে স্বল্প খরচে দেখানো যায়।

ডাক্তার কী চিকিৎসা দিতে পারেন?

ইনফেকশনের মাত্রা দেখে চিকিৎসক সাধারণত নিচের ব্যবস্থা নেন:

  • ইনফেকশনের ধরন বুঝে অ্যান্টিবায়োটিক মলম (যেমন মিউপিরোসিন জাতীয়) বা প্রয়োজনে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক
  • ব্যথা ও ফোলা কমাতে ওষুধ
  • পুঁজ জমে ফোড়া হলে ছোট অস্ত্রোপচারে পুঁজ বের করা
  • অ্যালার্জি হলে গয়না বদলানো বা অ্যান্টি-অ্যালার্জিক ওষুধ

ডাক্তার যে কোর্স দেবেন, তা সম্পূর্ণ শেষ করুন। ভালো লাগলেও মাঝপথে বন্ধ করবেন না।

ধনুষ্টংকার (টিটেনাস) টিকার কথা ভুলবেন না

ধারালো বা নোংরা সুই দিয়ে নাক ফোঁড়ালে টিটেনাসের ঝুঁকি থাকতে পারে। শেষবার কবে টিটেনাস টিকা নিয়েছেন, তা মনে না থাকলে বা ১০ বছরের বেশি হয়ে গেলে ডাক্তারকে জানান। প্রয়োজনে বুস্টার ডোজ নেওয়া ভালো।

ইনফেকশন এড়াতে আগে থেকেই যা করবেন

প্রতিকার নয়, প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো। নাক ফোঁড়ানোর আগে ও পরে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখুন:

  • সঠিক জায়গা বেছে নিন। প্রশিক্ষিত ব্যক্তি বা ক্লিনিকে নাক ফোঁড়ান, যেখানে জীবাণুমুক্ত নতুন সুই ও যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। পাড়ার দোকানে ফোঁড়ানোর আগে অন্তত জেনে নিন সুই ও যন্ত্র কীভাবে জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে।
  • ভালো মানের গয়না কিনুন। প্রথমবারেই সার্জিক্যাল স্টিল, টাইটানিয়াম বা খাঁটি সোনার নাকফুল ব্যবহার করুন। সস্তা কসমেটিক গয়না ফোঁড়ানো ক্ষতে পরবেন না।
  • নিয়মিত পরিষ্কার করুন। শুরুর কয়েক সপ্তাহ দিনে দুবার লবণ-পানি বা স্যালাইন দিয়ে পরিষ্কার করুন।
  • অকারণে ছোঁবেন না। হাত ধোয়া ছাড়া কখনোই ফোঁড়ানো জায়গা ছোঁবেন না।
  • ধৈর্য ধরুন। পুরোপুরি সেরে ওঠার আগে নাকফুল খুলে নতুনটা পরানোর তাড়াহুড়ো করবেন না।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)

১: নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন হলে কি নাকফুল খুলে ফেলব?
না, নিজে থেকে খুলবেন না। ছিদ্র বন্ধ হয়ে ভেতরে পুঁজ আটকে যেতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন।

২: ইনফেকশন সারতে কত দিন লাগে?
হালকা ইনফেকশন সঠিক যত্নে ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ভালো হতে পারে। গুরুতর ইনফেকশনে ডাক্তারের চিকিৎসায় আরও বেশি সময় লাগতে পারে।

৩: নাক ফোঁড়ানোর পর ফোলা ও লাল হওয়া কি সবসময় ইনফেকশন?
না। প্রথম কয়েক দিন হালকা লাল ও ফোলা স্বাভাবিক। ব্যথা, গরম ভাব ও পুঁজ বাড়তে থাকলে তখনই ইনফেকশনের সন্দেহ করুন।

৪: ঘরোয়া উপায়ে কি ইনফেকশন পুরোপুরি সারানো যায়?
একেবারে শুরুর দিকের হালকা ইনফেকশনে লবণ-পানির সেঁকে উপকার হতে পারে। কিন্তু অবস্থা খারাপ হলে বা ২ থেকে ৩ দিনে ভালো না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।

৫: নাক ফোঁড়ানোর জায়গায় গুটি বা দানার মতো হলে কী করব?
এটি ইরিটেশন বাম্প হতে পারে, কখনো কখনো কেলয়েডও হয়। নিজে খোঁচাবেন না। লবণ-পানি দিয়ে পরিষ্কার রাখুন এবং না কমলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখান।

নাক ফোঁড়ানোর পর ইনফেকশন হলে ভয় না পেয়ে শান্তভাবে প্রাথমিক যত্ন নেওয়া জরুরি। লবণ-পানির সেঁক, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও হাত না লাগানো হালকা ইনফেকশনে কার্যকর। 

তবে পুঁজ, জ্বর, ছড়িয়ে যাওয়া লালচে ভাব বা কার্টিলেজের ইনফেকশন হলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান। ডেটল, টুথপেস্ট বা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন।

বিঃদ্রঃ এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। নির্দিষ্ট সমস্যার ক্ষেত্রে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আরও জানুন…

কান দিয়ে পানি পড়ার হোমিও চিকিৎসা: কারণ, লক্ষণ ও করণীয়

কান ফুটো পেকে গেলে কি করনীয়: কারণ ও কখন ডাক্তার দেখাবেন

একটি মন্তব্য লিখুন