সিজারের পর কতদিন ব্লিডিং হয়, রক্তের রং কেমন বদলায় এবং কোন লক্ষণে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, তা জানুন সহজ ভাষায়।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় অর্ধেক সন্তানের জন্মই হচ্ছে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে। অপারেশনের পর অনেক মায়ের মনে একটি প্রশ্ন বারবার ঘোরে: সিজারের পর কতদিন ব্লিডিং হয়?
অনেকে ভাবেন, পেট কেটে বাচ্চা বের করা হয়েছে, তাই হয়তো রক্তপাত কম হবে বা একেবারেই হবে না। আবার কেউ ব্লিডিং দেখে ভয় পেয়ে যান। এই লেখায় সিজারের পর ব্লিডিংয়ের সময়কাল, স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক লক্ষণ এবং করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।
সিজারের পরও ব্লিডিং হয় কেন?
সন্তান জন্মের পর জরায়ুর ভেতরের দেয়াল থেকে প্লাসেন্টা (ফুল) আলাদা হয়ে যায়। ওই জায়গাটি একটি খোলা ক্ষতের মতো থাকে। এই ক্ষত শুকাতে সময় লাগে। এ সময় জরায়ুর ভেতরের রক্ত, শ্লেষ্মা ও মৃত কোষ যোনিপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে।
চিকিৎসার ভাষায় একে বলে লোকিয়া (Lochia)। তাই সিজার হোক বা normal delivery, প্রসবের পর যোনিপথে রক্তক্ষরণ হওয়া স্বাভাবিক।
সিজারে অপারেশনের সময় জরায়ুর ভেতরটা পরিষ্কার করা হয়, তাই অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় ব্লিডিং কিছুটা কম মনে হতে পারে। তবে ব্লিডিং একেবারে বন্ধ থাকে না।
সিজারের পর কতদিন ব্লিডিং হয়?
সাধারণত সিজারের পর ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত কমবেশি ব্লিডিং বা স্রাব হতে পারে।
কারও ক্ষেত্রে ৩ সপ্তাহের মধ্যেই কমে আসে, আবার কারও ক্ষেত্রে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। প্রতিটি মায়ের শরীর আলাদা, তাই সময়ের এই পার্থক্য অস্বাভাবিক নয়।
সময় অনুযায়ী ব্লিডিংয়ের ধরন
- প্রথম ৩-৪ দিন: রক্তের রং গাঢ় বা উজ্জ্বল লাল থাকে। পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হয়, অনেকটা মাসিকের ভারী দিনের মতো। ছোট ছোট রক্তের চাকা (ক্লট) বের হতে পারে।
- ৪ থেকে ১০ দিন: রক্তের রং ধীরে ধীরে গোলাপি বা বাদামি হয়ে আসে। পরিমাণ কমতে থাকে।
- ২ থেকে ৪ সপ্তাহ: স্রাব হালকা হলুদ বা সাদাটে রঙের হয়। পরিমাণ খুব কম থাকে।
- ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ: স্রাব ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে হালকা ফোঁটা ফোঁটা স্রাব আরও কিছুদিন থাকতে পারে।
কখন বেশি ব্লিডিং হতে পারে?
ব্লিডিং কমে আসার পর হঠাৎ কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। সাধারণত এমন হয় যখন:
- অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকার পর উঠে দাঁড়ালে
- বেশি হাঁটাহাঁটি বা ভারী কাজ করলে
- বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় (দুধ খাওয়ালে জরায়ু সংকুচিত হয়, ফলে রক্ত বেরিয়ে আসে)
- সকালে ঘুম থেকে উঠে
এটি সাধারণত চিন্তার বিষয় নয়। বিশ্রাম নিলে ও কাজের চাপ কমালে ঠিক হয়ে যায়।
সিজারের পর ইনফেকশনের কারণ: জেনে নিন প্রতিরোধের উপায়
কী কী লক্ষণ দেখলে এখনই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
সিজারের পর ব্লিডিং স্বাভাবিক হলেও কিছু লক্ষণ বিপদের ইঙ্গিত দেয়।
এগুলো দেখলে দেরি না করে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞের (গাইনি ডাক্তারের) কাছে যান বা নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন:
- এক ঘণ্টার মধ্যে একটি স্যানিটারি প্যাড পুরোপুরি ভিজে যাওয়া, এবং এভাবে একাধিক ঘণ্টা চলতে থাকা
- গলফ বল বা তার চেয়ে বড় আকারের রক্তের চাকা বের হওয়া
- ব্লিডিং কমে যাওয়ার পর হঠাৎ আবার উজ্জ্বল লাল রক্ত বেশি পরিমাণে আসা
- স্রাব থেকে দুর্গন্ধ আসা
- জ্বর (১০০.৪°ফা বা ৩৮°সে-এর বেশি) বা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর
- তলপেটে তীব্র ব্যথা
- মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি বা বুক ধড়ফড় করা
- সিজারের সেলাইয়ের জায়গা লাল হয়ে ফুলে যাওয়া, পুঁজ বা পানি বের হওয়া
- ৬ সপ্তাহ পার হওয়ার পরও ভারী ব্লিডিং চলতে থাকা
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণকে বলা হয় পোস্টপার্টাম হেমারেজ, যা সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মায়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই লক্ষণ বুঝলে “একটু দেখি” বলে অপেক্ষা করবেন না।
সিজারের পর ব্লিডিংয়ের সময় কী করবেন?
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
বাংলাদেশের অনেক বাড়িতে এখনো কাপড় ব্যবহারের প্রচলন আছে। সিজারের পর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই পুরোনো কাপড়ের বদলে পরিষ্কার স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করা ভালো। প্যাড প্রতি ৩-৪ ঘণ্টা পরপর বদলান।
ব্লিডিংয়ের সময় ট্যাম্পন বা মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করবেন না, এতে জীবাণু ঢোকার ঝুঁকি থাকে।
প্রতিবার টয়লেটের পর কুসুম গরম পরিষ্কার পানি দিয়ে যৌনাঙ্গ ধুয়ে নরম কাপড়ে মুছে নিন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন
প্রথম কয়েক সপ্তাহ ভারী কাজ, ভারী জিনিস তোলা বা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা এড়িয়ে চলুন। পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নিন। নতুন মায়ের বিশ্রামই সবচেয়ে বড় ওষুধ।
পুষ্টিকর খাবার খান
রক্তক্ষরণের কারণে শরীরে আয়রনের ঘাটতি হতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় রাখুন:
- মাছ, মাংস ও ডিম
- কচু শাক, পালং শাক, লাল শাক
- ডাল, বাদাম
- মৌসুমি ফল (পেয়ারা, কমলা, পেঁপে)
- পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি
ডাক্তার আয়রন ও ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট দিলে নিয়ম মেনে খান। নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করবেন না।
বুকের দুধ খাওয়ান
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের জরায়ু দ্রুত স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসে এবং ব্লিডিং নিয়ন্ত্রণে সাহায্য হয়।
সিজারের পর শুয়ে বা বালিশের সাহায্যে আরামদায়ক অবস্থানে বসে দুধ খাওয়ানো যায়।
সেলাইয়ের যত্ন নিন
ক্ষতস্থান শুকনো ও পরিষ্কার রাখুন। ডাক্তারের নির্দেশমতো ড্রেসিং করুন এবং সেলাই কাটার নির্ধারিত তারিখে ফলো-আপে যান।
যৌনমিলন ও ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন
সাধারণত ৬ সপ্তাহ বা ডাক্তার অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত যৌনমিলন থেকে বিরত থাকা উচিত। ব্লিডিং পুরোপুরি বন্ধ হওয়া এবং ক্ষত শুকানো জরুরি।

সিজারের পর পিরিয়ড কবে ফিরে আসে?
প্রসবের পরের ব্লিডিং (লোকিয়া) আর মাসিক এক জিনিস নয়। যে মা বুকের দুধ খাওয়ান, তাঁর মাসিক ফিরতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। যিনি দুধ খাওয়ান না, তাঁর ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে মাসিক ফিরতে পারে। প্রথম কয়েকটি মাসিক অনিয়মিত বা ভারী হতে পারে।
তবে মাসিক ফিরে আসার আগেও গর্ভধারণ সম্ভব, তাই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করুন।
বাংলাদেশে কোথায় চিকিৎসা নেবেন?
ব্লিডিং নিয়ে সমস্যা হলে আপনার এলাকার সুবিধা অনুযায়ী যোগাযোগ করতে পারেন:
- ঢাকায়: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল
- জেলা পর্যায়ে: জেলা সদর হাসপাতাল ও সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগ
- উপজেলা পর্যায়ে: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র
জরুরি পরামর্শের জন্য স্বাস্থ্য বাতায়নের হটলাইন ১৬২৬৩ নম্বরেও ফোন করা যায়। জরুরি অবস্থায় দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
১: “সিজারে ব্লিডিং হয় না।”
সঠিক তথ্য: সিজারেও ৪-৬ সপ্তাহ পর্যন্ত ব্লিডিং হতে পারে।
২: “গ্রামের পুরোনো টোটকা বা পাতার রস লাগালে ব্লিডিং দ্রুত বন্ধ হয়।”
সঠিক তথ্য: এমন টোটকা ক্ষতিকর হতে পারে এবং সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ব্লিডিং বেশি মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৩: “ব্লিডিং বেশি হলে শুধু পানি কম খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
সঠিক তথ্য: পানি কম খাওয়া সমাধান নয়, বরং শরীরের জন্য ক্ষতিকর। পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১: সিজারের ১ মাস পরও ব্লিডিং হচ্ছে, এটা কি স্বাভাবিক?
উত্তর: হালকা ও কম পরিমাণে হলে স্বাভাবিক। তবে পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে গেলে, দুর্গন্ধ থাকলে বা ব্যথা-জ্বর থাকলে ডাক্তার দেখান।
২: সিজারের পর ব্লিডিং একদম বন্ধ হয়ে গেলে কি সমস্যা?
উত্তর: ব্লিডিং হঠাৎ বন্ধ হয়ে পেট ফুলে গেলে, ব্যথা বা জ্বর হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ জরায়ুর ভেতরে রক্ত জমে থাকতে পারে।
৩: সিজারের পর কত দিন প্যাড ব্যবহার করতে হয়?
উত্তর: স্রাব পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত, সাধারণত ৪-৬ সপ্তাহ।
৪: ব্লিডিং চলাকালীন গোসল করা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, পরিষ্কার পানিতে গোসল করা যাবে। সেলাইয়ের জায়গা শুকনো রাখবেন এবং ডাক্তারের নির্দেশনা মেনে চলবেন।
সিজারের পর কতদিন ব্লিডিং হয়, এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো সাধারণত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ। প্রথম দিকে রক্তের পরিমাণ বেশি ও লাল থাকে, পরে ধীরে ধীরে হালকা হয়ে হলুদ বা সাদাটে হয়ে যায়।
তবে অতিরিক্ত ব্লিডিং, বড় চাকা, দুর্গন্ধ, জ্বর বা তীব্র ব্যথা দেখলে একদম দেরি করবেন না। নতুন মায়ের শরীর পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগে। পরিবারের সবার সহযোগিতা, পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রাম ও নিয়মিত ফলো-আপ মাকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য। কোনো শারীরিক সমস্যা হলে নিজে নিজে চিকিৎসা না করে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আরও জানুন…
