নারী স্বাস্থ্য

সিজারের পর ইনফেকশনের লক্ষণ: প্রতিটি মায়ের জানা জরুরি

সিজারের পর ইনফেকশনের লক্ষণ: প্রতিটি মায়ের জানা জরুরি

সিজারের পর ইনফেকশনের লক্ষণ চিনুন। সেলাইয়ের স্থানে লালচে ভাব, জ্বর, পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব হলে কী করবেন, জানুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। 

বাংলাদেশে অনেক মা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাড়িতে ফিরে যান। সেখানে নতুন শিশুর যত্ন, পরিবারের ব্যস্ততা আর নিজের ক্লান্তির মধ্যে ইনফেকশনের প্রাথমিক লক্ষণ চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। 

অথচ শুরুতেই ধরা পড়লে বেশিরভাগ ইনফেকশন সহজ চিকিৎসায় সেরে যায়। এই লেখায় সিজারের পর ইনফেকশনের লক্ষণ, কারণ, ঝুঁকি এবং করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।

সিজারের পর ইনফেকশন কেন হয়?

সিজারের সময় পেটের ত্বক, চর্বির স্তর, পেশি এবং জরায়ু কেটে শিশুকে বের করা হয়। এই কাটা অংশ দিয়ে জীবাণু ঢুকে ইনফেকশন ঘটাতে পারে। ইনফেকশন সাধারণত তিন জায়গায় হয়:

  • অস্ত্রোপচারের ক্ষত (সেলাইয়ের স্থান)
  • জরায়ুর ভেতরে (এন্ডোমেট্রাইটিস)
  • মূত্রনালি বা কিডনিতে

অপারেশনের ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ইনফেকশনের লক্ষণ বেশি দেখা যায়। তবে কখনো কখনো ৩০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সেলাইয়ের স্থানের ইনফেকশনের লক্ষণ

সিজারের ক্ষত ঠিকমতো শুকাচ্ছে কি না, তা প্রতিদিন নজর রাখুন। নিচের লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হোন।

ক্ষতের চারপাশে লালচে ভাব ও ফোলা
কিছুটা লালচে ভাব প্রথম কয়েকদিন স্বাভাবিক। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে লালচে ভাব বা ফোলা যদি কমার বদলে বাড়তে থাকে, তাহলে এটি ইনফেকশনের ইঙ্গিত হতে পারে।

ব্যথা বেড়ে যাওয়া
সিজারের পর ব্যথা সময়ের সাথে কমে আসার কথা। যদি ব্যথা কমে গিয়ে আবার বাড়ে, অথবা ক্ষতের জায়গা ছুঁলে অতিরিক্ত ব্যথা ও গরম অনুভব হয়, তাহলে সতর্ক হতে হবে।

পুঁজ বা তরল বের হওয়া
ক্ষত থেকে হলুদ বা সবুজাভ পুঁজ, ঘোলা তরল বা রক্তমিশ্রিত পানি বের হওয়া ইনফেকশনের স্পষ্ট লক্ষণ।

দুর্গন্ধ
ক্ষত বা ব্যান্ডেজ থেকে খারাপ গন্ধ আসা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

সেলাই খুলে যাওয়া বা ক্ষত ফাঁক হয়ে যাওয়া
সেলাইয়ের স্থানে ফাঁক তৈরি হলে বা ভেতরের স্তর দেখা গেলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।

সিজারের পর বেল্ট ব্যবহারের নিয়ম: সম্পূর্ণ গাইড

জরায়ুর ইনফেকশনের লক্ষণ (এন্ডোমেট্রাইটিস)

সিজারের পর স্বাভাবিক ডেলিভারির তুলনায় জরায়ুর ইনফেকশনের ঝুঁকি বেশি থাকে। 

এর লক্ষণগুলো হলো:

  • তলপেটে ক্রমাগত ব্যথা বা চাপ অনুভব করা
  • যোনিপথ দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা রক্তস্রাব বের হওয়া
  • স্রাবের রঙ হলদে বা সবুজাভ হয়ে যাওয়া
  • জ্বর ও শরীর কাঁপুনি
  • অতিরিক্ত দুর্বলতা

প্রসবের পর ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত রক্তস্রাব হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু স্রাবে তীব্র দুর্গন্ধ থাকলে বা হঠাৎ রক্তস্রাব বেড়ে গেলে বিষয়টি হালকাভাবে নেবেন না।

সিজারের পর ইনফেকশনের লক্ষণ

জ্বর: কখন বিপজ্জনক?

শরীরের তাপমাত্রা ১০০.৪°F (৩৮°C) বা তার বেশি হলে সেটিকে সতর্কসংকেত হিসেবে ধরা উচিত। অনেক পরিবারে প্রসূতির জ্বরকে “দুধ আসার জ্বর” বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। স্তনে দুধ জমলে হালকা জ্বর হতে পারে, এটা সত্য। 

কিন্তু সিজারের পর জ্বর এলে আগে ইনফেকশনের সম্ভাবনা বাদ দিতে হবে। তাই নিজে থেকে ধরে নেওয়ার বদলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মূত্রনালির ইনফেকশনের লক্ষণ

সিজারের সময় ক্যাথেটার (প্রস্রাবের নল) ব্যবহার করা হয়, যা মূত্রনালির ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ায়। লক্ষণগুলো হলো:

  • প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া
  • ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
  • প্রস্রাবে দুর্গন্ধ বা রক্ত
  • তলপেট বা কোমরে ব্যথা

স্তনের ইনফেকশন (ম্যাস্টাইটিস)

যদিও এটি সরাসরি সিজারের ক্ষত থেকে হয় না, প্রসব-পরবর্তী সময়ে এটি বেশ সাধারণ। স্তন শক্ত, লাল ও গরম হয়ে যাওয়া, তীব্র ব্যথা এবং জ্বর হলে ম্যাস্টাইটিস হতে পারে। বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

যেসব লক্ষণ দেখলে এখনই হাসপাতালে যেতে হবে

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান:

  • ১০২°F বা তার বেশি জ্বর, সঙ্গে কাঁপুনি
  • সিজারের ক্ষত থেকে অনবরত পুঁজ বা রক্ত বের হওয়া
  • সেলাইয়ের জায়গা আলাদা হয়ে ক্ষতের মুখ খুলে যাওয়া 
  • শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথা
  • পায়ে হঠাৎ ফোলা, ব্যথা ও লালচে ভাব (রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ হতে পারে)
  • ঘন ঘন প্যাড ভিজে যাওয়ার মতো অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
  • মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি, নাড়ির গতি খুব বেড়ে যাওয়া
  • তীব্র পেটব্যথা, যা ওষুধেও কমছে না

এসব লক্ষণ রক্তে ইনফেকশন (সেপসিস) বা অন্য গুরুতর জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে কল করতে পারেন। স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ নম্বরে স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক পরামর্শ পাওয়া যায়।

কাদের ঝুঁকি বেশি?

কিছু কারণে সিজারের পর ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়:

  • ডায়াবেটিস, বিশেষ করে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে
  • অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
  • রক্তস্বল্পতা (বাংলাদেশের অনেক নারীর মধ্যে এটি সাধারণ সমস্যা)
  • অপুষ্টি
  • দীর্ঘ সময় ধরে প্রসব ব্যথা চলার পর জরুরি সিজার
  • ধূমপান বা জর্দা-তামাক সেবন
  • অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বা অস্ত্রোপচারের পর অপর্যাপ্ত যত্ন

ইনফেকশন প্রতিরোধে কী করবেন?

ক্ষতের যত্ন

  • ক্ষত সবসময় পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
  • গোসলের পর নরম কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুছে নিন, ঘষবেন না।
  • ক্ষত স্পর্শ করার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
  • চিকিৎসক যেভাবে ড্রেসিং করতে বলেছেন, সেভাবেই করুন।

ওষুধ ও ফলোআপ

  • চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স পুরোটা শেষ করুন। ভালো লাগছে বলে মাঝপথে বন্ধ করবেন না।
  • নির্ধারিত সময়ে সেলাই কাটাতে বা ফলোআপে যান।

ঘরোয়া টোটকা এড়ান
আমাদের দেশে অনেক সময় ক্ষতে হলুদ, ঘি, তেল, ছাই বা অন্য কোনো ঘরোয়া জিনিস লাগানোর প্রবণতা দেখা যায়। এগুলো ইনফেকশনের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্ষতে কিছু লাগাবেন না।

পোশাক ও বিশ্রাম

  • ঢিলেঢালা, পরিষ্কার সুতির কাপড় পরুন।
  • ক্ষতের ওপর টাইট বেল্ট বা কাপড় চাপ দিয়ে বাঁধবেন না, চিকিৎসক পরামর্শ দিলে ভিন্ন কথা।
  • সিজারের পর কিছুদিন ভারী কিছু তোলা এবং কঠিন কাজ এড়িয়ে চলুন।
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, কিন্তু একেবারে শুয়ে না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ধীরে ধীরে হাঁটাচলা করুন। এতে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমে।

খাবার

  • ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল ও দুধের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান।
  • লেবু, পেয়ারা, কমলার মতো ভিটামিন সি-যুক্ত ফল খান।
  • শাকসবজি ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন।
  • প্রচুর পানি পান করুন।

প্রসাব ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা

  • প্রস্রাব চেপে রাখবেন না।
  • যোনিপথের স্রাবের জন্য পরিষ্কার প্যাড ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত বদলান।
  • প্রতিবার টয়লেটের পর সামনে থেকে পেছনের দিকে পরিষ্কার করুন।

ডাক্তার কীভাবে ইনফেকশন নির্ণয় ও চিকিৎসা করেন?

চিকিৎসক ক্ষত পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা (সিবিসি, সিআরপি), প্রস্রাব পরীক্ষা ও ক্ষত থেকে নমুনা নিয়ে কালচার করতে দিতে পারেন। জরায়ু বা পেটের ভেতরে পুঁজ জমার সন্দেহ হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়।

ইনফেকশনের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা ভিন্ন হয়:

  • হালকা ইনফেকশনে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক ও নিয়মিত ড্রেসিং
  • গুরুতর ইনফেকশনে হাসপাতালে ভর্তি করে শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক
  • ক্ষতে পুঁজ জমলে ছোট অপারেশনের মাধ্যমে পুঁজ বের করা ও পরিষ্কার করা

নিজে থেকে ওষুধের দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাবেন না। ভুল ওষুধ বা ভুল ডোজ ইনফেকশন আরও জটিল করতে পারে এবং ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১ঃ সিজারের কতদিন পর ইনফেকশন হতে পারে?
সাধারণত অপারেশনের ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে, তবে ৩০ দিন পর্যন্ত ইনফেকশন প্রকাশ পেতে পারে।

২ঃ সিজারের সেলাইয়ে সামান্য ব্যথা বা চুলকানি কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ, ক্ষত শুকানোর সময় হালকা ব্যথা ও চুলকানি স্বাভাবিক। কিন্তু সাথে লালচে ভাব, ফোলা, পুঁজ বা জ্বর থাকলে চিকিৎসকের কাছে যান।

৩ঃ ইনফেকশন হলে কি আবার অপারেশন লাগে?
সব ক্ষেত্রে নয়। বেশিরভাগ ইনফেকশন অ্যান্টিবায়োটিক ও ড্রেসিংয়ে সেরে যায়। পুঁজ জমলে বা ক্ষত গভীর হলে ছোট অস্ত্রোপচার লাগতে পারে।

৪ঃ ইনফেকশন নিয়ে কি বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হ্যাঁ। তবে কোন ওষুধ খাচ্ছেন, সেটি দুধ খাওয়ানোর জন্য নিরাপদ কি না, তা চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করে নিন।

সিজারের পর শরীর সুস্থ হতে সময় লাগে, আর এই সময়ে মায়ের সবচেয়ে বেশি যত্ন দরকার। 

ইনফেকশনের লক্ষণ যেমন ক্ষতে লালচে ভাব ও পুঁজ, জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা ক্রমবর্ধমান ব্যথা দেখলে লজ্জা বা দ্বিধা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। 

পরিবারের সদস্যদেরও বিষয়টি জানা থাকা দরকার, যাতে প্রসূতির কোনো সমস্যাকে “এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে” বলে অবহেলা না করা হয়। মনে রাখবেন, সময়মতো চিকিৎসা নিলে ইনফেকশন সহজে সারে, আর দেরি করলে তা মায়ের জীবনের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। কোনো ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যায় অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আরও জানুন…

সিজারের পর শোয়ার নিয়ম: সুস্থ হয়ে উঠতে যা জানা জরুরি

সিজারের পর কতদিন ব্লিডিং হয়? স্বাভাবিক নাকি বিপদ চিনবেন যেভাবে

একটি মন্তব্য লিখুন