নারী স্বাস্থ্য

পিরিয়ডের সময় শসা খেলে কি হয়? জেনে নিন বিজ্ঞান কী বলে

পিরিয়ডের সময় শসা খেলে কি হয়? জেনে নিন বিজ্ঞান কী বলে

পিরিয়ডের সময় শসা খেলে কি হয়, এতে কি ঠান্ডা লাগে বা ব্যথা বাড়ে? শসার উপকার, ঝুঁকি ও প্রচলিত ভুল ধারণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।

পিরিয়ডের সময় শসা খেলে কি হয়?

আমাদের দেশে মাসিক বা পিরিয়ড নিয়ে নানা ধরনের লোকমুখে প্রচলিত কথা আছে। “এই সময় ঠান্ডা খাবার খেও না”, “টক খেলে রক্তপাত বেড়ে যায়”, “শসা খেলে ব্যথা বাড়বে”। এসব কথা মা, খালা, দাদি বা পাড়াপ্রতিবেশীর কাছ থেকে অনেকেই শুনেছেন। 

ফলে অনেক মেয়ে ও নারী পিরিয়ডের সময় শসার মতো সহজে পাওয়া যায় এমন পুষ্টিকর সবজি থেকেও দূরে থাকেন।

তাহলে সত্যিই কি পিরিয়ডের সময় শসা খাওয়া ক্ষতিকর? এই লেখায় বিজ্ঞানসম্মত তথ্য ও বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসের আলোকে বিষয়টি সহজভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

সংক্ষেপে উত্তর

পিরিয়ডের সময় শসা খাওয়া সাধারণত নিরাপদ এবং উপকারী। শসা খেলে মাসিকের রক্তপাত বাড়ে বা ব্যথা বেড়ে যায়, এমন কোনো প্রমাণিত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। বরং শসার পানি ও ফাইবার এই সময়ের কিছু অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। 

তবে কারও যদি শসা খেলে গ্যাস বা পেটের সমস্যা হয়, তাহলে পরিমাণ কমিয়ে খাওয়াই ভালো।

শসায় কী কী পুষ্টি আছে?

শসার প্রায় ৯৫ শতাংশই পানি। এতে ক্যালোরি খুব কম, কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে:

  • পানি: শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে।
  • ফাইবার (বিশেষ করে খোসাসহ খেলে): হজমে সাহায্য করে।
  • ভিটামিন কে: ক্ষত হলে রক্তপাত থামাতে সহায়তা করে। 
  • ভিটামিন সি: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
  • পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম: পেশির স্বাভাবিক কাজ ও শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যে সহায়ক।

বাংলাদেশে শসা প্রায় সারা বছরই বাজারে পাওয়া যায় এবং দামও তুলনামূলক কম। তাই এটি সাধারণ পরিবারের জন্যও সহজে নাগালের মধ্যে থাকা একটি পুষ্টিকর খাবার।

পিরিয়ডের সময় শসা খেলে যে উপকারগুলো পেতে পারেন

শরীরে পানির ঘাটতি কমায়

পিরিয়ডের সময় শরীর থেকে রক্তের সঙ্গে কিছু তরল বের হয়। অনেকে এই সময় ক্লান্ত বোধ করেন, মাথা ঘোরে বা মুখ শুকিয়ে যায়। আমাদের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমেও প্রচুর পানি বেরিয়ে যায়। 

শসা পানির চমৎকার উৎস, তাই এটি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে।

ফোলাভাব বা ব্লোটিং কমাতে সহায়ক হতে পারে

অনেক নারী পিরিয়ডের আগে ও চলাকালে পেট ফাঁপা বা ফোলা ভাব অনুভব করেন। এর একটি কারণ শরীরে পানি ধরে রাখার প্রবণতা। পর্যাপ্ত পানি ও পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার এই অস্বস্তি কিছুটা কমাতে পারে। 

শসা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, তবে এটি কোনো চিকিৎসা নয়, শুধু সাধারণ সহায়ক খাবার।

কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে পারে

হরমোনের পরিবর্তনের কারণে কারও কারও পিরিয়ডের সময় কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেট পরিষ্কার না হওয়ার সমস্যা হয়। শসার ফাইবার ও পানি হজম সহজ করতে সাহায্য করে।

হালকা ও সহজপাচ্য খাবার

পিরিয়ডের সময় অনেকেরই ক্ষুধামন্দা বা বমি বমি ভাব থাকে। তখন ভারী, তেলেভাজা বা মসলাদার খাবার খেতে ইচ্ছা করে না। শসা হালকা ও সহজপাচ্য হওয়ায় এমন সময়ে খাবারের তালিকায় রাখা যায়।

পিরিয়ডের সময় শ্যাম্পু করলে কি হয়? মিথ বনাম বৈজ্ঞানিক সত্য

পিরিয়ডের সময় ঠান্ডা খাবার খেলে কি সত্যিই ক্ষতি হয়? 

বাংলাদেশে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, শসা, ডাবের পানি, দই বা বরফ-ঠান্ডা পানির মতো “ঠান্ডা” খাবার খেলে মাসিকের রক্ত জমে যায়, ব্যথা বাড়ে বা মাসিক বন্ধ হয়ে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধারণার পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। খাবারের “ঠান্ডা” বা “গরম” প্রকৃতি বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি, তা মূলত ঐতিহ্যগত বিশ্বাস। 

শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা সাধারণত নির্দিষ্ট থাকে, আর শসা খেলে জরায়ুর রক্তপ্রবাহ থেমে যায় বা জমে যায় না। মাসিক নিয়ন্ত্রণ করে মূলত হরমোন, যেমন ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন, খাবারের তাপমাত্রা নয়।

তবে কিছু বিষয় মনে রাখা ভালো:

  • কারও যদি আগে থেকেই ঠান্ডা লাগার ধাত থাকে, তাহলে খুব ঠান্ডা শসা বা ফ্রিজের শসা খেয়ে গলাব্যথা বা সর্দি হতে পারে। এর সঙ্গে পিরিয়ডের সরাসরি সম্পর্ক নেই।
  • কারও কারও ক্ষেত্রে বেশি শসা খেলে পেটে গ্যাস বা পাতলা পায়খানা হতে পারে, যা পিরিয়ডের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
পিরিয়ডের সময় শসা খেলে কি হয়

কখন শসা কম খাওয়া বা এড়িয়ে চলা উচিত?

শসা সাধারণ অবস্থায় নিরাপদ হলেও কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো:

  • শসা খেলে গ্যাস্ট্রিক বা পেট ব্যথা হয়: এমন হলে পরিমাণ কমান বা খোসা ছাড়িয়ে খান।
  • অ্যালার্জি আছে: খুব কম ক্ষেত্রে শসায় অ্যালার্জি হতে পারে। মুখে চুলকানি বা ফোলা দেখা দিলে খাওয়া বন্ধ করুন।
  • ডায়রিয়া চলছে: এই অবস্থায় বেশি কাঁচা সবজি না খাওয়াই ভালো।
  • অপরিষ্কার শসা: বাজার থেকে কেনা শসায় মাটি, জীবাণু বা কীটনাশকের অবশেষ থাকতে পারে। ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া জরুরি, না হলে পেটের সমস্যা হতে পারে।

বাংলাদেশে পিরিয়ডের সময় শসা কীভাবে খাবেন?

আমাদের দেশে শসা সাধারণত কয়েকভাবে খাওয়া হয়। 

পিরিয়ডের সময় এগুলো অনুসরণ করতে পারেন:

  • সালাদ হিসেবে: শসা, টমেটো, গাজর ও সামান্য লেবুর রস দিয়ে হালকা সালাদ।
  • দুপুরের ভাতের সঙ্গে: ডাল, সবজি ও মাছের সঙ্গে শসার কয়েক টুকরো রাখুন।
  • দইয়ের সঙ্গে: টক দই ও শসার রায়তা হজমে আরাম দিতে পারে, যদি আপনার দই সহ্য হয়।
  • শসার পানি: কয়েক টুকরো শসা পানিতে রেখে কিছুক্ষণ পর সেই পানি পান করা যায়।

কিছু টিপস:

  • খুব বেশি লবণ বা কাঁচা মরিচ মাখিয়ে শসা খাবেন না। অতিরিক্ত লবণ শরীরে পানি ধরে রাখতে পারে।
  • রাস্তার ধারের কাটা শসা এড়িয়ে চলুন, কারণ এতে জীবাণুর ঝুঁকি থাকে।
  • যদি ঠান্ডায় সমস্যা হয়, ফ্রিজ থেকে বের করে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এনে খান।
  • একবারে অনেক না খেয়ে দিনে এক-দুই মাঝারি আকারের শসাই যথেষ্ট।

পিরিয়ডের সময় আর কী কী খাওয়া ভালো?

শুধু শসা নয়, পুরো খাদ্যতালিকার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের অনেক নারী ও কিশোরীর শরীরে আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতা দেখা যায়। পিরিয়ডের রক্তপাতে এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। 

তাই এই সময় এসব খাবার রাখুন:

  • আয়রনসমৃদ্ধ খাবার: কচুশাক, পালংশাক, লাল শাক, কলিজা, ডিম, মাছ ও ডাল।
  • ভিটামিন সি-যুক্ত ফল: পেয়ারা, লেবু, আমলকী, কমলা। ভিটামিন সি আয়রন শোষণে সাহায্য করে।
  • পর্যাপ্ত পানি: দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস।
  • কলা: পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামে ভরপুর, যা পেশির খিঁচুনি ও টান কমাতে সাহায্য করতে পারে।
  • ডাবের পানি ও ঘরে তৈরি স্যালাইন: শরীর দুর্বল লাগলে বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে এগুলো স্বস্তি দিতে পারে।

আর যেগুলো কমিয়ে চলা ভালো: অতিরিক্ত চা-কফি, চিপস-ফাস্টফুডের মতো অতিরিক্ত লবণাক্ত ও তৈলাক্ত প্যাকেটজাত খাবার এবং অতিরিক্ত মিষ্টি। এগুলো ব্লোটিং ও মেজাজ খারাপের সমস্যা বাড়াতে পারে।

কুসংস্কার না মেনে শরীরের কথা শুনুন

প্রত্যেক নারীর শরীর আলাদা। কারও শসা খেলে কিছুই হয় না, আবার কারও পেটে অস্বস্তি হতে পারে। তাই কারও কথায় ভয় না পেয়ে নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করুন। কিছু খেয়ে খারাপ লাগলে সেটি কমান, আর ভালো লাগলে নিশ্চিন্তে খান।

পিরিয়ড নিয়ে লজ্জা বা কুসংস্কারের কারণে অনেক মেয়ে ও নারী পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনো এমন ধারণা প্রচলিত আছে। পরিবারের বড়দের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে আলোচনা করে এবং সঠিক তথ্য জেনে এই ভুল ধারণা দূর করা সম্ভব।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?

পিরিয়ডের সময় খাবার নিয়ে চিন্তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অস্বাভাবিক লক্ষণ চিনে নেওয়া। 

নিচের যেকোনো সমস্যা থাকলে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:

  • অতিরিক্ত রক্তপাত, যেমন ঘণ্টায় একাধিক প্যাড ভিজে যাওয়া
  • সহ্য করা কঠিন এমন তীব্র পেটব্যথা
  • মাসিক ৭ দিনের বেশি স্থায়ী হওয়া
  • পিরিয়ডের মাঝখানে রক্তপাত
  • খুব বেশি দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা

ঢাকা ও বড় শহরের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও নারী স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ পাওয়া যায়। লজ্জা না করে সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যান।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. পিরিয়ডের সময় শসা খেলে কি রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়?
না। শসা খেলে মাসিকের রক্তপাত বন্ধ হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। মাসিক হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

২. শসা খেলে কি পিরিয়ডের ব্যথা বাড়ে?
সাধারণত না। বরং হাইড্রেশন ঠিক থাকলে অস্বস্তি কিছুটা কম মনে হতে পারে। তবে কারও গ্যাস হলে পেট ব্যথা বাড়তে পারে।

৩. পিরিয়ডের সময় রাতে শসা খাওয়া যাবে কি?
যাবে। তবে রাতে অনেক বেশি খেলে ঘনঘন প্রস্রাব বা গ্যাসের কারণে ঘুমে সমস্যা হতে পারে, তাই পরিমাণে সংযত থাকুন।

৪. পিরিয়ডের সময় শসার জুস খাওয়া কি ঠিক?
ঠিক আছে, তবে চিনি বা বেশি লবণ না মেশানোই ভালো। পারলে ফাইবার বজায় রাখতে আস্ত শসা খান।

৫. শসা কি পিরিয়ড অনিয়মিত করে?
না। শসা পিরিয়ড অনিয়মিত করে, এমন কোনো তথ্য নেই। অনিয়মিত মাসিকের কারণ সাধারণত হরমোনজনিত সমস্যা, পিসিওএস, থাইরয়েড, মানসিক চাপ বা ওজনের পরিবর্তন।

পিরিয়ডের সময় শসা খেলে কি হয়, এই প্রশ্নের উত্তর হলো, স্বাভাবিকভাবে কোনো ক্ষতি হয় না, বরং শরীরে পানির চাহিদা পূরণ ও হজমে সহায়তা পাওয়া যায়। “শসা ঠান্ডা, তাই পিরিয়ডে ক্ষতি করে” এই ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। 

তবে প্রতিটি শরীর আলাদা, তাই পরিমিত খান, ভালোভাবে ধুয়ে খান এবং শরীর কেমন সাড়া দিচ্ছে তা খেয়াল করুন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি, বিশ্রাম ও প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ। পিরিয়ড কোনো লজ্জার বিষয় নয়, এটি নারী স্বাস্থ্যের স্বাভাবিক অংশ। সঠিক তথ্য জানলে কুসংস্কারের ভয় ছাড়াই এই সময়টা আরও সুস্থ ও স্বস্তিতে কাটানো সম্ভব।

বিঃদ্রঃ: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসমস্যায় অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আরও জানুন…

হলুদে কি এলার্জি আছে? লক্ষণ, কারণ ও করণীয়

গর্ভাবস্থায় কৃমি দূর করার ঘরোয়া উপায়

একটি মন্তব্য লিখুন