শিশু স্বাস্থ্য

শিশুর হাত পা ঠান্ডা মাথা গরম: কারণ, করণীয় ও কখন ডাক্তার দেখাবেন

শিশুর হাত পা ঠান্ডা মাথা গরম: কারণ, করণীয় ও কখন ডাক্তার দেখাবেন

শিশুর হাত পা ঠান্ডা মাথা গরম কেন হয়? কারণ, ঘরোয়া যত্ন ও কখন ডাক্তার দেখাবেন, জানুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।

শিশুর গা গরম অথচ হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা দেখলে বাবা-মা ঘাবড়ে যান, আর দাদি-নানিরা বলেন আরও কাঁথা জড়াতে।

এই লেখায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে বিষয়টি সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।

শিশুর হাত পা ঠান্ডা আর মাথা গরম হয় কেন?

আমাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা আছে। শরীর যখন ভেতরে তাপ ধরে রাখতে চায়, তখন হাত-পায়ের ছোট রক্তনালি সংকুচিত হয়ে যায়।

ফলে হাত-পায়ে রক্ত কম পৌঁছায় এবং সেগুলো ঠান্ডা লাগে। 

একই সময়ে মাথা, বুক ও পেটে রক্তপ্রবাহ বেশি থাকায় ওই অংশগুলো গরম থাকে।শিশুদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি পরিণত হয়নি।

তাই ছোট শিশুদের হাত-পা সহজেই ঠান্ডা হয়ে যায়, আর মাথা ও শরীর গরম অনুভূত হয়।

বাংলাদেশে শিশুর হাত পা ঠান্ডা মাথা গরমের সাধারণ কারণ

জ্বরের শুরুতে

জ্বর আসার ঠিক আগে বা শুরুর দিকে শরীর তাপমাত্রা বাড়াতে চায়। তখন হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, শিশু শীত শীত বোধ করে, কখনো কাঁপেও।

থার্মোমিটারে মাপলে দেখা যায় জ্বর এসেছে। জ্বর পুরোপুরি উঠে গেলে হাত-পা আবার স্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে যায়।

আবহাওয়া ও পোশাকের কারণে

বাংলাদেশে ঋতুর পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে বর্ষা থেকে শীতের মাঝামাঝি সময়ে, শিশুরা বেশি অসুস্থ হয়। কিছু সাধারণ ভুল এ সময় দেখা যায়।

  • ভোরে বা রাতে হঠাৎ ঠান্ডা পড়লে শিশুর হাত-পা খোলা থাকা।
  • শীতে মাথায় টুপি, গায়ে মোটা সোয়েটার দিয়ে বেশি মুড়িয়ে ফেলা। এতে মাথা ও শরীর গরম হয়, আর হাত-পায়ে মোজা না থাকলে সেগুলো ঠান্ডাই থাকে।
  • গরমের রাতে এসি বা ফ্যানের সরাসরি বাতাসে ঘুমানো।

নবজাতক ও ছোট শিশুর অপরিণত রক্তসঞ্চালন

নবজাতক ও কয়েক মাসের শিশুর হাত-পা প্রায়ই ঠান্ডা থাকে, আর এটি স্বাভাবিক।

শিশু যদি ভালোভাবে দুধ খায়, সক্রিয় থাকে, ঠিকমতো প্রস্রাব করে এবং ঠোঁট ও জিভ গোলাপি থাকে, তাহলে সাধারণত চিন্তার কারণ নেই।

পানিশূন্যতা

গ্রীষ্ম ও বর্ষায় ডায়রিয়া, বমি বা অতিরিক্ত ঘামের কারণে শিশুর শরীরে পানির ঘাটতি হতে পারে। তখন রক্তসঞ্চালন কমে গিয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়।

সঙ্গে জ্বর থাকলে মাথা গরম লাগে। মুখ শুকিয়ে যাওয়া, চোখ বসে যাওয়া এবং কম প্রস্রাব হওয়া এর লক্ষণ।

সংক্রমণ

নিউমোনিয়া, প্রস্রাবের সংক্রমণ, টাইফয়েড বা অন্য ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে জ্বরের সঙ্গে হাত-পা ঠান্ডা হতে পারে। বাংলাদেশে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে (আগস্ট থেকে নভেম্বর) ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। 

ডেঙ্গুতে জ্বর কমার পর হাত-পা হঠাৎ ঠান্ডা ও ঘর্মাক্ত হয়ে যাওয়া, শিশু নেতিয়ে পড়া এবং পেটে ব্যথা বিপদের লক্ষণ হতে পারে। এই অবস্থায় একটুও দেরি করা যাবে না।

রক্তস্বল্পতা ও অপুষ্টি

আমাদের দেশে শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা ও অপুষ্টি বেশ সাধারণ সমস্যা। রক্তে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে হাত-পা সহজে ঠান্ডা হয়ে যায়। সঙ্গে ফ্যাকাসে ভাব, দুর্বলতা ও খিটখিটে মেজাজ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অন্যান্য কারণ

হৃদরোগ বা থাইরয়েডের সমস্যা এবং এক ধরনের রক্তনালির সমস্যা (রেনোর ঘটনা) থেকেও শিশুর হাত-পা ঠান্ডা থাকতে পারে।

এগুলো তুলনামূলক কম দেখা যায়, কিন্তু বারবার একই সমস্যা হলে পরীক্ষা করানো ভালো।

আঙ্গুর খেলে কি ডায়াবেটিস বাড়ে? জানুন বিজ্ঞানসম্মত উত্তর
শিশুর হাত পা ঠান্ডা মাথা গরম

শিশুর হাত পা ঠান্ডা মাথা গরম হলে বাড়িতে কী করবেন?

প্রথমে শান্ত থাকুন, তারপর এই ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

  • তাপমাত্রা মাপুন। হাত দিয়ে আন্দাজ না করে ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করুন। আন্ডারআর্ম বা কপালের থার্মোমিটার ব্যবহার করা যায়। ফার্মেসিতে সহজেই পাওয়া যায়।
  • পোশাক ঠিক করুন। শিশু যদি বেশি মুড়ানো থাকে, অতিরিক্ত কাপড় খুলে হালকা সুতি পোশাক পরান। আবার হাত-পা ঠান্ডা থাকলে পাতলা মোজা পরাতে পারেন। ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন।
  • কুসুম গরম পানি দিয়ে গা মুছে দিন। জ্বর বেশি হলে নরম কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে শিশুর গা, ঘাড়, বগল ও কুঁচকি মুছে দিন। বরফ-ঠান্ডা পানি ব্যবহার করবেন না। এতে শিশু কাঁপতে পারে, আর শরীরের ভেতরের তাপ আরও আটকে যেতে পারে।
  • তরল খাওয়ান। বুকের দুধ খাওয়া শিশুকে বারবার বুকের দুধ দিন। বড় শিশুকে পানি, ডাবের পানি বা খাবার স্যালাইন দিন। ডায়রিয়া বা বমি থাকলে খাবার স্যালাইন অবশ্যই খাওয়াতে হবে।
  • জ্বরের ওষুধ নিয়ে সতর্ক থাকুন। প্যারাসিটামল সিরাপ আমাদের দেশে খুব পরিচিত, কিন্তু শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী মাত্রা ঠিক করতে হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে মাত্রা ঠিক করবেন না। ভুল মাত্রায় বিপদ হতে পারে।
  • শিশুকে পর্যবেক্ষণে রাখুন। শিশু কেমন সাড়া দিচ্ছে, খেলছে কি না, খাচ্ছে কি না এবং প্রস্রাব হচ্ছে কি না, এগুলো লক্ষ্য করুন।

যেসব ভুল ধারণা ও কাজ এড়িয়ে চলুন

  • জ্বরে শিশুকে কাঁথা বা কম্বলে পেঁচিয়ে রাখা। এতে জ্বর আরও বাড়তে পারে।
  • কপালে বা শরীরে বরফ লাগানো বা অ্যালকোহল দিয়ে মোছা। এটি বিপজ্জনক।
  • ঝাড়ফুঁক বা তাবিজের ওপর ভরসা করে ডাক্তার দেখানো পিছিয়ে দেওয়া। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
  • ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়ানো। এটি আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত অভ্যাস, কিন্তু অকারণে বা ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে ক্ষতি হয়।

কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতাল বা শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে যান।

  • তিন মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর, এমনকি সামান্য জ্বরও।
  • হাত-পা ঠান্ডা ও ফ্যাকাসে বা নীলচে, ত্বকে ছোপ ছোপ দাগ।
  • শিশু অস্বাভাবিক ঝিমিয়ে আছে, ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না বা খুব বেশি কাঁদছে।
  • বুকের দুধ বা খাবার একদমই খাচ্ছে না।
  • ছয় থেকে আট ঘণ্টা বা তার বেশি সময় প্রস্রাব হয়নি।
  • শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা বুক দেবে যাওয়া।
  • খিঁচুনি।
  • বারবার বমি, তীব্র পেটব্যথা বা রক্তপাত।
  • ডেঙ্গু মৌসুমে জ্বর কমার পরও শিশুর অবস্থা খারাপ হতে থাকা।
  • তিন দিনের বেশি জ্বর থাকা।

ঢাকায় থাকলে ঢাকা শিশু হাসপাতাল বা অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগে যেতে পারেন।ঢাকার বাইরে থাকলে জেলা সদর হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করুন। 

জরুরি পরামর্শের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬২৬৩ বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা যায়।

প্রতিরোধের উপায়

  • ঋতু অনুযায়ী পোশাক পরান। ঠান্ডায় লেয়ারে পোশাক দিন, যাতে প্রয়োজনে একটি খুলে ফেলা যায়।
  • বুকের দুধ নিশ্চিত করুন। জন্মের পর ছয় মাস শুধু বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
  • টিকা সময়মতো দিন। ইপিআই কার্ড অনুযায়ী সব টিকা নিশ্চিত করুন।
  • পুষ্টিকর খাবার দিন। ছয় মাসের পর ডিম, মাছ, ডাল, শাকসবজি ও মৌসুমি ফল খাওয়ান। রক্তস্বল্পতা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শে আয়রন সাপ্লিমেন্ট দিন।
  • হাত ধোয়া ও বিশুদ্ধ পানি। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং নিরাপদ পানি পান ডায়রিয়া ও সংক্রমণ কমায়।
  • মশা প্রতিরোধ করুন। বাসার আশপাশে পানি জমতে দেবেন না, শিশুকে দিনে-রাতে মশারির নিচে রাখুন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এটি জরুরি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন ১: শিশুর হাত পা ঠান্ডা কিন্তু জ্বর নেই, এটা কি স্বাভাবিক?
উত্তর: হ্যাঁ, প্রায়ই স্বাভাবিক, বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে। শিশু সক্রিয় থাকলে, খাচ্ছে এবং ঘুমাচ্ছে ঠিকমতো, তাহলে চিন্তার কারণ নেই।

বারবার হলে বা সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকলে ডাক্তার দেখান।

প্রশ্ন ২: শিশুর মাথা গরম কিন্তু থার্মোমিটারে জ্বর ওঠে না, কেন?
উত্তর: অতিরিক্ত পোশাক, গরম ঘর, কান্না বা ঘুমের পর শিশুর মাথা গরম লাগতে পারে। থার্মোমিটার দিয়ে মেপে নিশ্চিত হোন।

প্রশ্ন ৩: হাত পা ঠান্ডা মানে কি শিশুর ঠান্ডা লেগেছে?
উত্তর: না, সবসময় নয়। হাত-পা ঠান্ডা মানেই সর্দি-কাশি বা “ঠান্ডা লাগা” নয়। এটি রক্তসঞ্চালনের একটি স্বাভাবিক বা অসুস্থতার সংকেত হতে পারে।

এরকম হলে বেশিরভাগ সময় এটি জ্বরের শুরু বা আবহাওয়ার প্রভাবের কারণে হয়ে থাকে এবং সঠিক যত্নে ঠিক হয়ে যায়।

তবে শিশু ঝিমিয়ে পড়লে, খাওয়া বন্ধ করলে, হাত-পা নীলচে বা ফ্যাকাসে হলে এবং ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বর কমার পরও অবস্থার অবনতি হলে দেরি করা যাবে না। 

শিশুর ক্ষেত্রে সন্দেহ হলে অপেক্ষা না করে ডাক্তারের কাছে যাওয়াই নিরাপদ।

বি.দ্র.: এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি কোনো চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।

আপনার শিশুর অসুস্থতায় অবশ্যই নিবন্ধিত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

মুখে সাদা ছুলি দূর করার উপায়: কারণ, ঘরোয়া যত্ন ও চিকিৎসা

মুখে বেসন মাখার অপকারিতা: ব্যবহারের আগে যা জানা জরুরি

একটি মন্তব্য লিখুন