শিশুর টিকা দিলে জ্বর আসে কেন, এটি কি স্বাভাবিক, ঘরে কী করবেন এবং কখন ডাক্তার দেখাবেন, বাংলাদেশের ইপিআই টিকা কর্মসূচির আলোকে জেনে নিন।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, শিশুর টিকা দিলে জ্বর আসে কেন? টিকায় কি কোনো সমস্যা ছিল, নাকি শিশুর শরীরে কিছু ঠিক নেই?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, টিকার পর হালকা জ্বর খুবই স্বাভাবিক এবং এটি প্রায়ই প্রমাণ করে যে শিশুর শরীর টিকায় সাড়া দিচ্ছে।
এই লেখায় কারণ, ঘরোয়া পরিচর্যা এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, সবকিছু সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো।
টিকা দিলে শিশুর জ্বর আসে কেন?
টিকায় থাকে মৃত বা দুর্বল করা জীবাণু, জীবাণুর কোনো অংশ বা তার তৈরি করা প্রোটিন।
এগুলো রোগ ঘটাতে পারে না, কিন্তু শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জীবাণু চিনিয়ে দেয়। টিকা শরীরে ঢোকার পর ইমিউন সিস্টেম একে “বিদেশি বস্তু” হিসেবে শনাক্ত করে এবং প্রতিক্রিয়া শুরু করে।
এ সময় শরীরে কিছু রাসায়নিক পদার্থ (যেমন সাইটোকাইন) নিঃসৃত হয়। এগুলো মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে সংকেত দেয়, ফলে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যায়। এটাই টিকা-পরবর্তী জ্বর।
সহজ কথায়, জ্বর মানে শিশুর শরীর “প্রশিক্ষণ” নিচ্ছে। শরীর ভবিষ্যতে আসল রোগের জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়ার জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি করছে।
কোন টিকায় জ্বর বেশি দেখা যায়?
বাংলাদেশের ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) অনুযায়ী শিশুরা জন্মের পর থেকে একে একে বিভিন্ন টিকা পায়। সব টিকায় জ্বর হয় না। তবে কিছু টিকায় তুলনামূলক বেশি দেখা যায়:
- পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা (ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি ও হিব): ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে দেওয়া হয়। এতে জ্বর, ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা ও ফোলা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
- নিউমোককাল (পিসিভি) টিকা: কিছু শিশুর হালকা জ্বর ও খিটখিটে ভাব হতে পারে।
- হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা: ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। এতে জ্বর সাধারণত টিকার ৫ থেকে ১২ দিন পর আসে এবং কখনো হালকা ফুসকুড়িও হতে পারে।
- বিসিজি টিকা: সাধারণত জ্বর হয় না। তবে ইনজেকশনের জায়গায় ছোট ফোসকা বা ঘা হয়, যা স্বাভাবিক।
(টিকার সময়সূচি নিয়ে নিশ্চিত হতে আপনার নিকটস্থ ইপিআই কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন, কারণ কর্মসূচিতে সময়ে সময়ে পরিবর্তন আসতে পারে।)

টিকার পর জ্বর কখন আসে এবং কতক্ষণ থাকে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জ্বর টিকা দেওয়ার ৬ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসে এবং ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে আপনাআপনি কমে যায়।
জ্বরের সঙ্গে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায়:
- টিকার জায়গায় লালচে ভাব, ব্যথা বা ফোলা
- সাধারণ চেয়ে বেশি কান্না ও খিটখিটে মেজাজ
- ঘুম বেশি বা কম হওয়া
- কিছুটা কম দুধ খাওয়া বা ক্ষুধামান্দ্য
এই লক্ষণগুলো স্বাভাবিক। শিশু যদি মাঝে মাঝে হাসে, খেলে এবং দুধ খায়, তাহলে চিন্তার কিছু নেই।
মুরগির ডিম খেলে কি প্রেসার বাড়ে? জেনে নিন আসল সত্য
টিকার পর শিশুর জ্বর হলে ঘরে কী করবেন?
শিশুকে বুকের দুধ বা পর্যাপ্ত তরল খাওয়ান
জ্বরের সময় শরীর থেকে পানি বেশি বের হয়। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুকে শুধু বুকের দুধ দিন।
বড় শিশুদের বুকের দুধের পাশাপাশি ভাত বা খিচুড়ির পানি, স্যালাইন বা ফলের রস দিতে পারেন।
হালকা পোশাক পরান
মোটা কাপড়ে জড়িয়ে রাখবেন না। এতে তাপ বের হতে পারে না এবং জ্বর আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় পাতলা সুতির কাপড় সবচেয়ে ভালো। ঘর বাতাসযুক্ত রাখুন।
কুসুম গরম পানিতে গা মুছে দিন
ঠান্ডা পানি বা বরফ ব্যবহার করবেন না। এতে শিশু কাঁপতে পারে এবং অস্বস্তি বাড়ে। নরম কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে কপাল, ঘাড়, হাত ও পা মুছে দিন।
টিকার জায়গায় ঠান্ডা সেঁক
ফোলা বা ব্যথা থাকলে পরিষ্কার ভেজা কাপড় দিয়ে হালকা সেঁক দিতে পারেন। টিকার জায়গায় কোনো তেল, মলম বা ঘরোয়া প্রলেপ লাগাবেন না।
প্রয়োজনে প্যারাসিটামল
চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল সিরাপ দেওয়া যেতে পারে। শিশুদের ওষুধের মাত্রা নির্ভর করে ওজন ও ওষুধের ধরনের ওপর, তাই নিজে থেকে মাত্রা ঠিক করবেন না।
ওষুধের প্যাকেটের লেবেল দেখুন অথবা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে সঠিক মাত্রা জেনে নিন। শিশুকে অ্যাসপিরিন কখনোই দেবেন না।
একটি জরুরি বিষয়, টিকা দেওয়ার আগে “যেন জ্বর না আসে” ভেবে নিজে থেকে প্যারাসিটামল খাওয়ানো সাধারণত পরামর্শ দেওয়া হয় না।
এটি টিকার প্রতি শরীরের সাড়া কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। ওষুধ দেবেন শুধু জ্বর এলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন?
বেশিরভাগ জ্বর নিরীহ হলেও কিছু লক্ষণ দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে:
- ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর (১০০.৪°ফা বা ৩৮°সে. বা তার বেশি) হলে
- জ্বর ১০৪°ফারেনহাইট (৪০°সে.) বা তার বেশি হলে
- জ্বর ৪৮ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হলে
- শিশুর খিঁচুনি হলে
- একটানা ৩ ঘণ্টার বেশি অস্বাভাবিক কান্না করলে
- শিশু অতিরিক্ত নিস্তেজ, ঝিমুনিভাব বা ডাকলে সাড়া না দিলে
- শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, শ্বাসের গতি খুব দ্রুত হলে বা ঠোঁট নীলচে হয়ে গেলে
- বুকের দুধ বা অন্য কিছু একেবারেই খেতে না চাইলে
- সারা গায়ে ছড়ানো ফুসকুড়ি, মুখ বা ঠোঁট ফুলে যাওয়া অথবা শরীরে চাকা চাকা দাগ দেখা দিলে (এগুলো অ্যালার্জির লক্ষণ হতে পারে)
- টিকার জায়গায় লালচে ভাব ক্রমশ ছড়াতে থাকলে বা পুঁজ হলে
এমন পরিস্থিতিতে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল বা শিশু হাসপাতালে যান। প্রয়োজনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় কল সেন্টার ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে পরামর্শ নিতে পারেন।
টিকার জ্বর নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
১: “জ্বর হলে পরবর্তী ডোজ না নেওয়াই ভালো।”
টিকার পর সাধারণ জ্বর হলে পরের ডোজ বাদ দেওয়ার কোনো কারণ নেই। নির্ধারিত সময়ে টিকা সম্পূর্ণ করুন। কোনো গুরুতর প্রতিক্রিয়া হলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিন।
২: “টিকা নিলে শিশুর শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।”
টিকা শিশুকে দুর্বল করে না, বরং হাম, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া ও পোলিওর মতো মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করে।
৩: “ঝাড়ফুঁক বা তাবিজে জ্বর কমবে।”
এসব ব্যবহার না করে বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা অনুসরণ করুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে যান।
টিকার আগে ও পরে মা-বাবার প্রস্তুতি
- শিশুর টিকার কার্ড সঙ্গে নিয়ে যান। টিকাদানকারীকে জানান শিশুর আগে কোনো টিকায় অ্যালার্জি হয়েছিল কি না।
- শিশু বর্তমানে তীব্র অসুস্থ থাকলে বা অন্য কোনো গুরুতর সমস্যা থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীকে বলুন।
- টিকা দেওয়ার পর অন্তত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট কেন্দ্রে অপেক্ষা করুন, যাতে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া হলে সাহায্য পান।
- বাড়ি ফেরার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা শিশুর দিকে বিশেষ নজর রাখুন, বিশেষ করে রাতে।
- পরবর্তী টিকার তারিখ টিকার কার্ডে লিখিয়ে নিন এবং মোবাইলে রিমাইন্ডার দিয়ে রাখুন।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
টিকা দিলে সব শিশুর কি জ্বর হয়?
না। অনেক শিশুর একেবারেই জ্বর হয় না। এটি টিকার ধরন, শিশুর বয়স ও শরীরের সাড়ার ওপর নির্ভর করে।
টিকার জ্বর কত দিন থাকে?
সাধারণত ১ থেকে ২ দিন। হাম-রুবেলা টিকার ক্ষেত্রে জ্বর কয়েকদিন পরে আসতে পারে এবং ১ থেকে ২ দিন থাকে।
টিকার পর শিশুকে গোসল করানো যাবে?
জ্বর না থাকলে কুসুম গরম পানিতে হালকা গোসল করানো যায়। জ্বর থাকলে গা মুছে দেওয়াই ভালো।
টিকার জায়গায় ঘষাঘষি করবেন না।
টিকার জায়গায় গুটি বা শক্ত দানা হলে কী করবেন?
এটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়। তবে পুঁজ হলে বা ব্যথা বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের কাছে যান।
বাংলাদেশে সরকারি কেন্দ্রের টিকা কি নিরাপদ?
হ্যাঁ। ইপিআই কর্মসূচির টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী পরীক্ষিত ও অনুমোদিত। দেশের সব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে এই টিকা পাওয়া যায়।
শিশুর শরীর টিকার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। হালকা জ্বর, ব্যথা ও খিটখিটে ভাব সাময়িক ও স্বাভাবিক। শিশুকে পর্যাপ্ত তরল দিন, হালকা পোশাক পরান এবং শিশুর আচরণের দিকে নজর রাখুন। কোনো বিপদচিহ্ন দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মনে রাখবেন, টিকার সামান্য অস্বস্তির তুলনায় টিকা না দিলে রোগের ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই জ্বরের ভয়ে টিকা বাদ না দিয়ে নির্ধারিত সময়ে শিশুর সব টিকা সম্পূর্ণ করুন। একটি সুস্থ শিশুই সুস্থ ভবিষ্যতের ভিত্তি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। আপনার শিশুর নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আরও দেখুন…
