বুক ধরফর করে কোন ভিটামিনের অভাবে? ভিটামিন বি১২, ফোলেট ও আয়রনের ঘাটতির লক্ষণ, সহজলভ্য খাবার ও ডাক্তার দেখানোর সময় জানুন।
হঠাৎ বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ, মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এসেছে। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে অনেকেরই আছে। অনেকে ভয় পেয়ে ভাবেন, “আমার কি হার্টের রোগ হলো?” অনেকের মনে প্রশ্ন আসে বুক ধরফর করে কোন ভিটামিনের অভাবে
প্রশ্নটা যুক্তিসংগত। কারণ কিছু ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি সত্যিই হৃদস্পন্দনের ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর উত্তর একটি নির্দিষ্ট ভিটামিনে সীমাবদ্ধ নয়। এই লেখায় বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে আলোচনা করা হলো।
বুক ধড়ফড় করা আসলে কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্যালপিটেশন। এ অবস্থায় আপনি নিজের হৃদস্পন্দন স্পষ্ট টের পান। কখনো মনে হয় হৃৎপিণ্ড খুব দ্রুত চলছে, কখনো মনে হয় একটি স্পন্দন বাদ পড়ে গেল বা জোরে ধাক্কা দিল। এটি নিজে কোনো রোগ নয়, বরং একটি উপসর্গ।
এর পেছনে থাকতে পারে ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, মানসিক চাপ, অতিরিক্ত চা-কফি বা হৃদরোগ।
প্রধান কারণগুলো
ভিটামিন বি১২-এর অভাব
বুক ধড়ফড়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘাটতি ভিটামিন বি১২। এই ভিটামিন লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। বি১২ কমে গেলে রক্তে অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা কমে যায়।
তখন শরীরের চাহিদা মেটাতে হৃৎপিণ্ডকে বেশি দ্রুত কাজ করতে হয় এবং ফলে ধড়ফড় অনুভূত হয়।
সাধারণ লক্ষণ:
- অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়া
- হাত-পা ঝিনঝিন করা বা অসাড় লাগা
- মাথা ঘোরা
- মুখের ভেতর জ্বালাপোড়া বা জিহ্বা লালচে হওয়া
- স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
বি১২ প্রধানত প্রাণিজ খাবারে পাওয়া যায়। তাই যারা মাছ, মাংস, ডিম, দুধ কম খান, তাদের ঝুঁকি বেশি। এছাড়া বয়স্ক মানুষ, দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনকারী এবং ডায়াবেটিসের কিছু ওষুধ (মেটফরমিন) গ্রহণকারীদের মধ্যেও এই ঘাটতি দেখা যেতে পারে।
ভিটামিন বি৯ (ফোলেট বা ফলিক অ্যাসিড)-এর অভাব
ফোলেটও রক্তকণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর অভাবে মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হতে পারে, যার ফল ধড়ফড়, দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্ট। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে ফোলেটের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, তাই তাদের বিশেষ সতর্ক থাকা দরকার।
আয়রন বা লৌহের অভাব (ভিটামিন নয়, তবে সবচেয়ে বড় কারণ)
কথাটা সরাসরি বলা দরকার। আয়রন ভিটামিন নয়, এটি খনিজ। কিন্তু বাংলাদেশে বুক ধড়ফড়ের সবচেয়ে সাধারণ পুষ্টিজনিত কারণ সম্ভবত আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতা। এ দেশের নারী ও কিশোরীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা একটি পরিচিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
মাসিকের রক্তক্ষরণ, গর্ভাবস্থা এবং ভাত-নির্ভর ও আমিষ-কম খাদ্যাভ্যাস এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। ভাতের সঙ্গে বা খাবারের ঠিক পরপর চা খেলে চায়ের ট্যানিন শরীরে আয়রন শোষণে বাধা দেয়।
চায়ের প্রতি আমাদের ভালোবাসা এখানে অজান্তেই সমস্যা বাড়াতে পারে।
সিজারের পর শোয়ার নিয়ম
ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়ামের ঘাটতি
এগুলোও ভিটামিন নয়, খনিজ। তবে হৃদস্পন্দনের স্বাভাবিক ছন্দ ধরে রাখতে এদের ভূমিকা অনেক বড়। ম্যাগনেসিয়াম বা পটাসিয়াম কমে গেলে হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক সংকেতে গোলমাল হতে পারে, ফলে অনিয়মিত বা দ্রুত স্পন্দন অনুভূত হয়।
অতিরিক্ত ঘাম, ডায়রিয়া, বমি বা পানিশূন্যতার পর এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। আমাদের গরমের দিনে রোজ ঘাম ঝরানো মানুষ, বিশেষ করে শ্রমজীবী ও মাঠে কাজ করা মানুষ এতে ঝুঁকিতে থাকেন।
ভিটামিন বি১ (থায়ামিন) ও ভিটামিন ডি
থায়ামিনের মারাত্মক অভাবে হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। এটি বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দেখা গেলেও অতিরিক্ত মদ্যপান বা অপুষ্টির ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি আমাদের দেশে খুব সাধারণ।
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, রোদের দেশ হয়েও আমাদের বহু মানুষের, বিশেষ করে নারী ও শহুরে মানুষের, ভিটামিন ডি কম। ভিটামিন ডি সরাসরি ধড়ফড়ের কারণ কি না, এ নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
তবে এর অভাবে পেশির দুর্বলতা ও ক্লান্তি হয়, যা পরোক্ষভাবে অস্বস্তি বাড়াতে পারে।

শুধু ভিটামিন নয়: অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ
ভিটামিনের ঘাটতিকেই একমাত্র দোষ দেওয়া ঠিক নয়। নিচের কারণগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ:
- থাইরয়েডের সমস্যা: হাইপারথাইরয়েডিজমে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, সঙ্গে ওজন কমা, হাত কাঁপা ও অতিরিক্ত ঘাম হয়।
- দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ: পরীক্ষা, চাকরি বা সংসারের চাপে বুক ধড়ফড় খুবই সাধারণ।
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন: দিনে বহুবার চা-কফি বা এনার্জি ড্রিংক।
- ধূমপান ও জর্দা-দোক্তা: নিকোটিন হৃদস্পন্দন বাড়ায়।
- হৃদরোগ: অনিয়মিত স্পন্দন (অ্যারিদমিয়া), ভালভের সমস্যা ইত্যাদি।
- কিছু ওষুধ: হাঁপানির ওষুধ বা ঠান্ডা-কাশির কিছু ওষুধ।
বাংলাদেশের সহজলভ্য খাবারে কীভাবে ঘাটতি পূরণ করবেন
ঘাটতি পূরণের জন্য দামি সাপ্লিমেন্টের দিকে ছুটতে হবে না। আমাদের চেনা খাবারেই অনেক সমাধান আছে।
ভিটামিন বি১২-এর জন্য: মাছ (রুই, কাতলা, ইলিশ), মুরগির মাংস, গরু বা খাসির কলিজা, ডিম, দুধ ও দই।
ফোলেটের জন্য: পুঁইশাক, পালংশাক, লালশাক, ডাল (মসুর, মুগ, ছোলা), মটরশুঁটি ও কমলা।
আয়রনের জন্য: কলিজা, ডিমের কুসুম, কচুশাক, ডাটাশাক, কুমড়ার বিচি, খেজুর, গুড় ও ডাল। ছোট মাছ যেমন মলা-ঢেলা মাছ আয়রন ও ক্যালসিয়াম দুটোরই ভালো উৎস।
আয়রনযুক্ত খাবারের সঙ্গে লেবু, আমলকী বা পেয়ারার মতো ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার খেলে শোষণ ভালো হয়।
ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়ামের জন্য: কলা, ডাবের পানি, বাদাম, কুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, আলু ও শাকসবজি।
ভিটামিন ডি-র জন্য: সকালে ১০-১৫ মিনিট রোদে থাকা, ডিমের কুসুম ও ছোট মাছ। শহরের অনেক মানুষ ফ্ল্যাটে থাকেন বা অফিসে সারাদিন কাটান, তাদের জন্য রোদে যাওয়ার অভ্যাসটি খুব জরুরি।
জীবনযাত্রায় যা বদলাবেন
- খাবারের ঠিক পরপর চা খাওয়া এড়িয়ে চলুন; অন্তত এক ঘণ্টা বিরতি দিন।
- প্রচুর পানি পান করুন, বিশেষ করে গরমে।
- চা-কফি ও এনার্জি ড্রিংক কমিয়ে দিন।
- রাতে পর্যাপ্ত ঘুমান।
- গভীর শ্বাস ও হালকা ব্যায়াম বা হাঁটার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমান।
- নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে ভিটামিন কিনে খাওয়ার অভ্যাস বাদ দিন। অতিরিক্ত আয়রন বা কিছু ভিটামিন ক্ষতিও করতে পারে।
কখন অবশ্যই ডাক্তার দেখাবেন?
বুক ধড়ফড় অনেক সময় নিরীহ হলেও কিছু লক্ষণ থাকলে দেরি করা উচিত নয়।
এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান:
- বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হলে
- শ্বাসকষ্ট হলে
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লাগলে বা সত্যিই জ্ঞান হারালে
- ধড়ফড় অনেকক্ষণ ধরে থাকলে বা বারবার হলে
- পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে
- ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে
ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট (NICVD), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) বা জেলা পর্যায়ের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কার্ডিওলজি বিভাগে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
সাধারণ ক্ষেত্রে প্রথমে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে দেখালেও চলে।
কী কী পরীক্ষা করাতে হতে পারে?
ডাক্তার সাধারণত উপসর্গ শুনে নিচের পরীক্ষাগুলো দিতে পারেন:
- সিবিসি (CBC) ও হিমোগ্লোবিন, রক্তস্বল্পতা ধরার জন্য
- সিরাম ফেরিটিন, শরীরে আয়রনের মজুত জানার জন্য
- ভিটামিন বি১২ ও ফোলেট লেভেল
- থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (TSH)
- সিরাম ইলেকট্রোলাইট (সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম)
- ই.সি.জি (ECG), প্রয়োজনে ইকো বা হোল্টার মনিটর
পরীক্ষার ফল দেখে ডাক্তারই ঠিক করবেন আপনার সমস্যা ভিটামিনের ঘাটতির কারণে কি না এবং কী ধরনের চিকিৎসা দরকার।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১: শুধু ভিটামিন বি১২ খেলেই কি ধড়ফড় ভালো হয়ে যাবে?
ঘাটতি থাকলে হয়তো উপকার হবে। কিন্তু ধড়ফড়ের কারণ অন্য কিছু হলে শুধু বি১২ কাজ করবে না। আগে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
২: রক্তস্বল্পতা থাকলে কি বুক ধড়ফড় করে?
হ্যাঁ। রক্তে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে শরীরে অক্সিজেন পৌঁছাতে হৃৎপিণ্ডকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, ফলে ধড়ফড় হতে পারে।
৩: রাতে শুয়ে থাকলে বুক ধড়ফড় করে কেন?
দিনের ব্যস্ততা শেষে শান্ত অবস্থায় আমরা হৃদস্পন্দন বেশি টের পাই। দুশ্চিন্তা, ক্যাফেইন বা রক্তস্বল্পতাও এর কারণ হতে পারে।
৪: ডাবের পানি কি ধড়ফড় কমাতে সাহায্য করে?
ডাবের পানিতে পটাসিয়াম থাকে, যা ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যে সাহায্য করে। তবে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়।
বুক ধরফর করে কোন ভিটামিনের অভাবে, এই প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, প্রধানত ভিটামিন বি১২ ও ফোলেটের অভাবে, সঙ্গে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়ামের ঘাটতিও বড় ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রক্তস্বল্পতা, ভাত-নির্ভর খাদ্যাভ্যাস, খাবারের পর চা পান এবং রোদ কম পাওয়ার অভ্যাস এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে মনে রাখবেন, সব ধড়ফড়ই ভিটামিনের অভাবে হয় না। তাই নিজে নিজে ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে রক্ত পরীক্ষা ও ই.সি.জি করিয়ে কারণ নিশ্চিত হোন।
সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি, ভালো ঘুম ও দুশ্চিন্তা কমানো, এই সহজ অভ্যাসগুলোই আপনার হৃদয়কে সুস্থ রাখতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করবে। লক্ষণ গুরুতর মনে হলে বা বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট থাকলে দেরি না করে হাসপাতালে যান।
সতর্কতা: এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি কোনো চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। যেকোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আরও জানুন…
