গর্ভাবস্থায় কৃমি দূর করার ঘরোয়া উপায় কী কী? কোন টোটকা নিরাপদ, কোনটি ক্ষতিকর এবং কখন ডাক্তার দেখাবেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জেনে নিন।
গর্ভাবস্থায় শরীরে অনেক পরিবর্তন আসে। এ সময় পেটে অস্বস্তি, ক্লান্তি বা রক্তশূন্যতা দেখা দিলে অনেকেই ভাবেন এটা গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক সমস্যা। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক সময় এর পেছনে কৃমিও একটি কারণ হতে পারে।
তাই অনেক মা ইন্টারনেটে খোঁজেন গর্ভাবস্থায় কৃমি দূর করার ঘরোয়া উপায়। এখানে একটি কথা শুরুতেই বলা দরকার। গর্ভাবস্থায় সব ঘরোয়া টোটকা নিরাপদ নয়, আর শুধু ঘরোয়া উপায়ে কৃমি পুরোপুরি দূর হয়েছে এমন নিশ্চয়তাও নেই।
এই লেখায় আমরা দেখব কী করলে কৃমির ঝুঁকি কমে, কোন অভ্যাস নিরাপদ, কোন জিনিস এড়ানো উচিত এবং কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
বাংলাদেশে গর্ভবতী নারীদের কৃমি হয় কেন?
বাংলাদেশের আবহাওয়া গরম ও আর্দ্র, আর অনেক এলাকায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি আছে। এসব কারণে কৃমির সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
সাধারণ কারণগুলো হলো:
- অপরিষ্কার হাতে খাবার খাওয়া ও রান্না করা
- খালি পায়ে মাটিতে হাঁটা (বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, যা হুকওয়ার্মের প্রধান কারণ)
- অপরিষ্কার বা অধোয়া কাঁচা সবজি, সালাদ ও ফল খাওয়া
- অনিরাপদ পানি পান করা
- রাস্তার খোলা খাবার, যেমন ফুচকা, চটপটি, কাটা ফল ও শরবত
- নখ বড় থাকা এবং নখের ভেতর ময়লা জমা
- শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত না ধোয়া
বাংলাদেশে সাধারণত গোলকৃমি, হুকওয়ার্ম, ফিতাকৃমি ও সুতাকৃমির সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।
গর্ভাবস্থায় কৃমির লক্ষণ
সব ক্ষেত্রে লক্ষণ স্পষ্ট হয় না। তবে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে সতর্ক হওয়া উচিত:
- পেটব্যথা বা পেট ফাঁপা
- ক্ষুধামান্দ্য, অথবা অস্বাভাবিক ক্ষুধা
- ওজন না বাড়া বা কমে যাওয়া
- অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ফ্যাকাশে ভাব (রক্তশূন্যতার লক্ষণ)
- ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা
- মলদ্বারে চুলকানি, বিশেষ করে রাতে (সুতাকৃমিতে)
- মলের সঙ্গে কৃমি বের হওয়া
- বমিভাব বা বমি, যা গর্ভাবস্থার সাধারণ বমি থেকে আলাদা করা কঠিন
পিরিয়ডের সময় টক খেলে কি হয়?
গর্ভাবস্থায় কৃমি কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
হুকওয়ার্ম অন্ত্রে রক্ত শুষে নেয়। ফলে গর্ভবতী মায়ের রক্তশূন্যতা বাড়তে পারে। এই রক্তশূন্যতা মা ও শিশু দুজনের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে কম ওজনের শিশু জন্ম, অপরিণত প্রসব বা প্রসবকালীন জটিলতার আশঙ্কা বাড়ে। তাই কৃমিকে অবহেলা করা ঠিক নয়।

ঘরোয়া উপায় ও অভ্যাস
গর্ভাবস্থায় কৃমি দূর করার ঘরোয়া উপায় বলতে মূলত প্রতিরোধ ও শরীরের যত্নকে বোঝায়। নিচের অভ্যাসগুলো মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ এবং কৃমির সংক্রমণ ও পুনঃসংক্রমণ কমাতে কার্যকর।
সাবান দিয়ে বারবার হাত ধোয়া
খাবার খাওয়ার আগে, রান্নার আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। এটি কৃমি প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়।
নখ ছোট রাখা
নখের ভেতরে কৃমির ডিম জমতে পারে। সপ্তাহে অন্তত একবার নখ কেটে পরিষ্কার রাখুন।
ফোটানো বা বিশুদ্ধ পানি পান করা
পানি অন্তত ১ মিনিট ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করুন। ফিল্টার করা পানিও ব্যবহার করা যায়। সম্ভব হলে নিরাপদ গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করুন।
কাঁচা সবজি ও ফল ভালোভাবে ধোয়া
সালাদ, শসা, গাজর বা ফল খাওয়ার আগে প্রবাহিত পানিতে ভালো করে ধুয়ে নিন। সম্ভব হলে খোসা ছাড়িয়ে খান। গর্ভাবস্থায় কাঁচা বা আধাসেদ্ধ মাংস ও মাছ এড়ানো ভালো।
টাটকা ও ভালোভাবে রান্না করা খাবার খাওয়া
ঢেকে রাখা, গরম ও পরিষ্কারভাবে রান্না করা খাবার খান। রাস্তার খোলা খাবার, কাটা ফল ও বরফযুক্ত শরবত এড়িয়ে চলুন।
জুতা বা স্যান্ডেল পরা
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বা মাটির পথে খালি পায়ে হাঁটবেন না। হুকওয়ার্মের লার্ভা পায়ের চামড়া ভেদ করে শরীরে ঢুকতে পারে।
আয়রনসমৃদ্ধ ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
কৃমির কারণে রক্তশূন্যতার ঝুঁকি থাকে, তাই খাবারে এগুলো রাখুন:
- কচু শাক, পালং শাক, লাল শাক, পুঁই শাক
- কলিজা (ভালোভাবে রান্না করা), ডিম, মাছ
- ডাল, বাদাম, গুড়
- লেবু, আমলকী, পেয়ারার মতো ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল (আয়রন শোষণে সহায়ক)
আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত খেতে হবে।
টক দই খাওয়া
টক দই অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে এটি কৃমি মেরে ফেলে, এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। সহায়ক খাবার হিসেবে খেতে পারেন, ওষুধের বিকল্প হিসেবে নয়।
পরিবারের সবাইকে সচেতন করা
ঘরের একজনের কৃমি থাকলে অন্যদেরও থাকতে পারে। শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সুতাকৃমির ক্ষেত্রে পরিবারের সবার একসঙ্গে চিকিৎসা নেওয়া ভালো, নইলে সংক্রমণ বারবার ফিরে আসে।
শৌচাগার ও পরিবেশ পরিষ্কার রাখা
স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করুন এবং শৌচাগার পরিষ্কার রাখুন। বিছানার চাদর, তোয়ালে ও অন্তর্বাস নিয়মিত গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকান।
যেসব ঘরোয়া টোটকা গর্ভাবস্থায় এড়িয়ে চলবেন
ইন্টারনেট ও মুখে মুখে অনেক টোটকা প্রচলিত আছে। কিন্তু এর কিছু গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর হতে পারে।
- কাঁচা পেঁপে ও পেঁপের বীজ: কাঁচা পেঁপেতে থাকা ল্যাটেক্স জরায়ুর সংকোচন ঘটাতে পারে। এতে গর্ভপাত বা অপরিণত প্রসবের ঝুঁকি থাকে। গর্ভাবস্থায় কাঁচা পেঁপে ও পেঁপের বীজ একেবারেই এড়িয়ে চলুন।
- নিমপাতা বা নিমের রস: নিম গর্ভাবস্থায় নিরাপদ নয়। এটি গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- অতিরিক্ত কাঁচা রসুন: স্বাভাবিক রান্নায় রসুন ঠিক আছে। কিন্তু কৃমি তাড়ানোর উদ্দেশ্যে বেশি পরিমাণে কাঁচা রসুন খেলে পেটে জ্বালা ও রক্তপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে।
- ক্যাস্টর অয়েল (ক্যাস্টর অয়েল/এরণ্ড তেল) বা জোলাপ: এগুলো জরায়ুর সংকোচন ঘটাতে পারে।
- হারবাল, কবিরাজি বা অজানা গাছগাছড়ার ওষুধ: উপাদান অজানা থাকলে গর্ভাবস্থায় এগুলো খাওয়া ঠিক নয়।
- কেরোসিন, ফিটকিরি বা অন্য কোনো রাসায়নিকযুক্ত টোটকা: এগুলো বিপজ্জনক।
গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, গর্ভাবস্থায় কোনো ঘরোয়া টোটকা বা ভেষজ কিছু খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
কৃমির ওষুধ: ডাক্তারের পরামর্শ কেন জরুরি?
যদি কৃমির সংক্রমণ নিশ্চিত হয় বা সন্দেহ থাকে, তাহলে ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পথ।
- সাধারণত গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে (প্রথম ট্রাইমেস্টার) কৃমির ওষুধ এড়ানো হয়।
- কৃমির সংক্রমণ বেশি এমন এলাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার থেকে ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে কৃমিনাশক ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। এতে মা ও শিশু উভয়ের উপকার হয়।
- কোন ওষুধ, কতটুকু মাত্রায় এবং কখন খাবেন তা ডাক্তার ঠিক করবেন। নিজে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাবেন না।
গর্ভাবস্থার নিয়মিত চেকআপে (ANC) কৃমির কথা ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীকে জানান। সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকেও এ বিষয়ে পরামর্শ পাওয়া যায়।
কখন দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যাবেন?
গর্ভাবস্থায় নিচের যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যান:
- অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা ফ্যাকাশে ভাব
- তীব্র পেটব্যথা বা বারবার বমি
- কালো বা রক্তমিশ্রিত পায়খানা
- ঘন ঘন পাতলা পায়খানা, শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ
- মলের সঙ্গে কৃমি বের হওয়া
- ওজন না বাড়া বা কমে যাওয়া
- শ্বাসকষ্ট বা বুক ধড়ফড় করা
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১: গর্ভাবস্থায় কৃমির সংক্রমণ হলে কি গর্ভের শিশুর ক্ষতি হতে পারে?
উত্তর: বেশিরভাগ কৃমি সরাসরি গর্ভের শিশুর ক্ষতি করে না। কিন্তু কৃমির কারণে মায়ের রক্তশূন্যতা ও অপুষ্টি হলে শিশুর বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়তে পারে।
২: গর্ভাবস্থায় কি নিজে নিজে কৃমির ওষুধ খাওয়া যায়?
উত্তর: না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না। সময় ও মাত্রা ডাক্তারই নির্ধারণ করবেন।
৩: পেঁপে কি কৃমি তাড়ায়?
উত্তর: পাকা পেঁপে পুষ্টিকর এবং পরিমিত খেলে সাধারণত সমস্যা নেই। কিন্তু কাঁচা পেঁপে ও পেঁপের বীজ গর্ভাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ, তাই এগুলো একেবারেই এড়িয়ে চলুন।
৪: ঘরোয়া উপায়ে কি কৃমি পুরোপুরি সেরে যায়?
উত্তর: ঘরোয়া উপায় প্রতিরোধ ও পুনঃসংক্রমণ ঠেকাতে সাহায্য করে। কিন্তু সংক্রমণ নিশ্চিত হলে কার্যকর চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায় কৃমি দূর করার ঘরোয়া উপায় বলতে মূলত পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানি ও খাবার এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসই বোঝায়। এগুলো মানলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমে। কিন্তু কাঁচা পেঁপে, নিম বা অজানা ভেষজের মতো টোটকা মা ও শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সন্দেহ হলে দেরি না করে গর্ভাবস্থার নিয়মিত চেকআপে ডাক্তারকে জানান এবং তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন। আপনার ও আপনার অনাগত সন্তানের সুস্থতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রিমাইন্ডারঃ এই লেখাটি শুধুমাত্র সচেতনতার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা বা ওষুধের ক্ষেত্রে অবশ্যই registered ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
আরও জানুন…
