হাত ঝিনঝিন এর ব্যায়াম নিয়মিত করলে কমে অবশ ভাব ও স্নায়ুর চাপ। জানুন ৮টি সহজ ব্যায়াম, কারণ, খাবার এবং বাংলাদেশে কখন ডাক্তার দেখাবেন।
হাত ঝিনঝিন করা বা হাত অবশ হয়ে আসা আমাদের দেশে খুব পরিচিত একটি সমস্যা। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন হাত অসাড়, অফিসে কম্পিউটারে কাজ করতে করতে আঙুলে সুঁই ফোটার মতো অনুভূতি, কিংবা রান্নাঘরে কাজ করতে গিয়ে হাত ঝিম ধরে গেল।
অনেকে হাত ঝিনঝিনকে সামান্য সমস্যা মনে করে এড়িয়ে যান। কিন্তু বারবার এমন হলে এর পেছনে স্নায়ুতে চাপ, ভিটামিনের ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো অসুখ লুকিয়ে থাকতে পারে।
আজকের লেখায় জানব হাত ঝিনঝিন এর ব্যায়াম, এর প্রধান কারণ, কোন খাবার উপকারী এবং বাংলাদেশে কখন ডাক্তার দেখানো দরকার।
হাত ঝিনঝিন করে কেন?
আমাদের হাতের স্নায়ু ঘাড় থেকে শুরু হয়ে কাঁধ, কনুই ও কব্জি হয়ে আঙুল পর্যন্ত গেছে। এই পথের কোথাও চাপ পড়লে বা রক্তসঞ্চালন কমে গেলে হাত ঝিনঝিন করে।
বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু কারণ হলো:
- কার্পাল টানেল সিনড্রোম: কব্জির কাছে মিডিয়ান নার্ভে চাপ পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটার, মোবাইল বা সেলাই মেশিনে কাজ করলে এটি বেশি হয়।
- ভিটামিন বি১২ ও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি: আমাদের দেশে অনেক মানুষের, বিশেষ করে নারীদের, এই ঘাটতি দেখা যায়।
- ডায়াবেটিস: রক্তে সুগারের মাত্রা অনেক দিন ধরে বেশি থাকলে স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে বলা হয় ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি।
- সার্ভাইক্যাল স্পন্ডিলোসিস: ঘাড়ের হাড়ের সমস্যায় স্নায়ুতে চাপ পড়ে হাত পর্যন্ত ঝিনঝিন ছড়ায়।
- ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানো: হাতের ওপর মাথা রেখে বা হাত ভাঁজ করে ঘুমালে সকালে হাত অবশ লাগে।
- অতিরিক্ত পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ: গার্মেন্টস শ্রমিক, দর্জি, কৃষক, রিকশাচালক বা নির্মাণ শ্রমিকদের হাতের ওপর চাপ বেশি পড়ে।
- থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যানিমিয়া ও গর্ভাবস্থা: এগুলোও কারণ হতে পারে।
ঘরে বসে করার ৮টি সহজ উপায়
নিচের ব্যায়ামগুলো নিয়মিত করলে স্নায়ুর ওপর চাপ কমে, রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং আঙুলের নমনীয়তা ফিরে আসে। প্রতিটি ব্যায়াম ধীরে ও আরামদায়কভাবে করুন। ব্যথা বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান।
কব্জি ঘোরানো (Wrist Circles)
সোজা হয়ে বসে দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দিন। মুঠো হালকা করে কব্জি ঘড়ির কাঁটার দিকে ১০ বার, তারপর উল্টো দিকে ১০ বার ঘোরান। অফিসে বসেই এটি করা যায়।
প্রার্থনা ভঙ্গির স্ট্রেচ (Prayer Stretch)
বুকের সামনে দুই হাতের তালু জোড়া করুন, আঙুল ওপরের দিকে থাকবে। ধীরে ধীরে হাত নাভির দিকে নামান, যতক্ষণ না কব্জি ও হাতের ভেতরের দিকে টান অনুভব করেন। ১৫-৩০ সেকেন্ড ধরে রেখে ৩-৫ বার করুন।
কব্জির ভেতরের পেশির স্ট্রেচ
ডান হাত সামনে সোজা করে তালু ওপরের দিকে রাখুন। বাম হাত দিয়ে ডান হাতের আঙুলগুলো আলতো করে নিচের দিকে টানুন। ১৫-২০ সেকেন্ড ধরে রাখুন। তারপর হাত বদলান।
কব্জির বাইরের পেশির স্ট্রেচ
ডান হাত সামনে বাড়িয়ে তালু নিচের দিকে রাখুন। বাম হাত দিয়ে আঙুলের পিঠ ধরে আলতো করে নিচে চাপ দিন।
১৫-২০ সেকেন্ড পর হাত বদলান। যারা সারাদিন মাউস বা কিবোর্ডে কাজ করেন, তাদের জন্য এটি খুব উপকারী।
মুঠো করা ও খোলা (Fist Open-Close)
হাত সামনে বাড়িয়ে আঙুল পুরো ছড়িয়ে দিন, তারপর ধীরে ধীরে শক্ত করে মুঠো করুন। এভাবে ১০-১৫ বার করুন। এটি আঙুলের রক্তসঞ্চালন বাড়ায়।
টেন্ডন গ্লাইডিং ব্যায়াম
হাত সোজা করে আঙুল একসাথে রাখুন। এরপর ধাপে ধাপে আঙুলের ডগা ভাঁজ করে “হুক” আকৃতি, “সম্পূর্ণ মুঠো” এবং “সোজা মুঠো” আকৃতি তৈরি করুন। প্রতিটি অবস্থানে ৩-৫ সেকেন্ড থেকে আবার সোজা হয়ে যান। দিনে ৫-১০ বার করুন।
কি খেলে ঘুম আসবে না?
বুড়ো আঙুল ও অন্য আঙুলের স্পর্শ (Thumb Opposition)
বুড়ো আঙুলের ডগা দিয়ে পর্যায়ক্রমে তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা ও কনিষ্ঠার ডগা ছুঁয়ে একটি গোল আকৃতি তৈরি করুন। দুই হাতে ১০ বার করে করুন। ছোট জিনিস ধরতে অসুবিধা হলে এটি বিশেষ কাজে আসে।
ঘাড় ও কাঁধের ব্যায়াম
হাত ঝিনঝিনের উৎস অনেক সময় ঘাড়ে থাকে, তাই ঘাড়ের ব্যায়ামও জরুরি।
- চিন টাক: সোজা বসে থুতনি ধীরে ধীরে পেছনে টেনে ৫ সেকেন্ড ধরে রাখুন। ১০ বার করুন।
- কাঁধ ঘোরানো: দুই কাঁধ ওপরের দিকে তুলুন, তারপর পেছনের দিকে গোল করে ঘুরিয়ে নামান। এভাবে ১০ বার করুন।
- ঘাড় কাত করা: কান কাঁধের দিকে আলতো করে নামিয়ে ১৫ সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর অন্য দিকে করুন।
সতর্কতা: ঘাড় জোরে ঘোরাবেন না বা ঝাঁকাবেন না। ঘাড়ের সমস্যা গুরুতর হলে আগে ডাক্তার বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।

ব্যায়ামের নিয়ম: কতবার ও কখন করবেন?
- দিনে ২-৩ বার, প্রতিবার ৫-১০ মিনিট ব্যায়াম করুন।
- অফিসে কাজের মাঝে প্রতি ৩০-৪৫ মিনিট পর ১-২ মিনিটের বিরতি নিয়ে কব্জি ও আঙুল নাড়ান।
- সকালে ঘুম থেকে উঠে ও রাতে ঘুমানোর আগে ব্যায়াম করলে বেশি উপকার পাওয়া যায়।
- হালকা গরম পানিতে হাত কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে ব্যায়াম করলে পেশি শিথিল হয়।
- নিয়মিত না করলে ফল পেতে দেরি হয়, তাই ধৈর্য ধরে প্রতিদিন করুন।
খাদ্যাভ্যাস: কী খেলে উপকার পাবেন?
শুধু ব্যায়াম নয়, স্নায়ুর সুস্থতায় খাবারেরও বড় ভূমিকা আছে। বাংলাদেশে সহজলভ্য কিছু খাবার:
- ভিটামিন বি১২-সমৃদ্ধ খাবার: মাছ (রুই, কাতলা, ইলিশ, সার্ডিন), ডিম, দুধ, দই, মুরগি ও গরুর মাংস, কলিজা।
- ক্যালসিয়াম: দুধ, ছোট মাছ (মলা, ঢেলা, পুঁটি), কাঁটাসহ মাছ, শাকসবজি।
- ম্যাগনেসিয়াম ও বি-ভিটামিন: ডাল, বাদাম, লাল আটা, লাল শাক, পালংশাক।
- পর্যাপ্ত পানি: দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। পানিশূন্যতা পেশির টান বাড়াতে পারে।
ডায়াবেটিসের রোগী হলে মিষ্টি, সাদা ভাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং নিয়মিত রক্তের সুগার পরীক্ষা করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ভিটামিন বা ক্যালসিয়ামের ওষুধ খাবেন না।
দৈনন্দিন জীবনে যা মেনে চলবেন
- কাজের ভঙ্গি ঠিক রাখুন। কম্পিউটারে কাজ করার সময় কব্জি সোজা রাখুন এবং কনুই ৯০ ডিগ্রি কোণে বাঁকিয়ে রাখুন। কিবোর্ড ও মাউসের নিচে নরম প্যাড দিলে কব্জির ওপর চাপ কমবে।
- মোবাইলের ব্যবহার কমান। দীর্ঘক্ষণ এক হাতে মোবাইল ধরে স্ক্রল করলে বুড়ো আঙুল ও কব্জির ওপর চাপ পড়ে। হাত বদলে বদলে ব্যবহার করুন।
- ঘুমানোর ভঙ্গি পাল্টান। হাতের ওপর মাথা রেখে বা হাত ভাঁজ করে ঘুমাবেন না। বালিশ ঠিক উচ্চতায় রাখুন।
- ভারী জিনিস তোলায় সতর্ক থাকুন। বাজারের ভারী ব্যাগ একই হাতে বেশিক্ষণ বহন করবেন না।
- ধূমপান ও অতিরিক্ত চা-কফি কমান। ধূমপান রক্তসঞ্চালন কমিয়ে স্নায়ুর ক্ষতি বাড়ায়।
- নিয়মিত হাঁটুন। প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটলে সারা শরীরের রক্তসঞ্চালন ভালো থাকে।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
ঘরোয়া ব্যায়ামে অনেকের আরাম হলেও কিছু ক্ষেত্রে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত:
- ২-৩ সপ্তাহ ব্যায়াম করেও উন্নতি না হলে।
- ঝিনঝিনের সঙ্গে হাতে দুর্বলতা আসলে বা জিনিস হাত থেকে পড়ে গেলে।
- রাতে ঝিনঝিনে ঘুম ভেঙে গেলে।
- হঠাৎ এক পাশের হাত ও মুখ অবশ হলে, কথা জড়িয়ে গেলে বা বুকে ব্যথা হলে। এগুলো স্ট্রোক বা হৃদরোগের লক্ষণ হতে পারে, তাই তাৎক্ষণিক হাসপাতালে যান।
- ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা কিডনির সমস্যা থাকলে।
সাধারণত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, নিউরোলজিস্ট বা ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ এই সমস্যা দেখেন।
ঢাকায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এবং বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসব বিভাগ রয়েছে।
ফিজিওথেরাপির জন্য সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যেমন সাভারের সিআরপি।
চিকিৎসক প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা (ডায়াবেটিস, বি১২, থাইরয়েড), এনসিভি বা এমআরআই পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
সাধারণ কিছু ভুল ধারণা
- “হাত ঝিনঝিন করলে তেল মালিশই যথেষ্ট।” মালিশে সাময়িক আরাম মেলে, কিন্তু মূল কারণ খুঁজে চিকিৎসা না করলে সমস্যা ফিরে আসে।
- “আঙুল মটকালে ঝিনঝিন কমে।” এটি উপকারের বদলে জয়েন্টের ক্ষতি করতে পারে।
- “নিজে নিজে ভিটামিন খেলেই সেরে যাবে।” পরীক্ষা না করে ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়।
হাত ঝিনঝিন এর ব্যায়াম নিয়মিত করলে বেশিরভাগই উপসর্গ কমে আসে, বিশেষ করে কাজের চাপ বা ভুল ভঙ্গির কারণে হলে। তবে এটি কোনো রোগের চূড়ান্ত চিকিৎসা নয়।
ব্যায়ামের পাশাপাশি সঠিক খাবার, সঠিক ভঙ্গি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ, এই চারটি মিলিয়েই স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়।
আজ থেকেই দিনে কয়েক মিনিট সময় বের করে এই সহজ ব্যায়ামগুলো শুরু করুন। শরীরের সামান্য লক্ষণকে গুরুত্ব দিলে বড় সমস্যা এড়ানো যায়।
দাবিত্যাগ: এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি কোনো চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ থাকলে অবশ্যই registered চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আরও জানুন…
