জীবনযাপন

থাইরয়েড টেস্ট কি খালি পেটে করতে হয়? সম্পূর্ণ গাইড

থাইরয়েড টেস্ট কি খালি পেটে করতে হয়? সম্পূর্ণ গাইড

থাইরয়েড টেস্ট কি খালি পেটে করতে হয়? TSH, T3, T4 টেস্টে না খেয়ে যেতে হবে কি না, সঠিক সময়, ওষুধ খাওয়ার নিয়ম ও বাংলাদেশে খরচ জেনে নিন।

থাইরয়েড টেস্ট করাতে বললে অনেকেই ভাবেন, ভোরে না খেয়ে ল্যাবে যেতে হবে। কেউ কেউ আবার ঘুম থেকে উঠে চা-নাশতা সেরে তারপর যান, পরে ভয় পান যে রিপোর্ট ভুল আসবে কি না। তাই প্রশ্নটা খুব সাধারণ: থাইরয়েড টেস্ট কি খালি পেটে করতে হয়?

সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, সাধারণত না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থাইরয়েড টেস্টের জন্য খালি পেটে থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখলে রিপোর্ট আরও নির্ভরযোগ্য হয়। সেগুলো নিচে বিস্তারিত বলা হলো।

থাইরয়েড টেস্ট কী এবং কেন করা হয়?

থাইরয়েড গলার সামনের দিকে প্রজাপতি আকৃতির একটি গ্রন্থি। এটি থেকে নিঃসৃত হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃৎস্পন্দন, ওজন, শরীরের তাপমাত্রা ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এই গ্রন্থির কাজে গোলমাল হলে দুটি সমস্যা দেখা দিতে পারে:

  • হাইপোথাইরয়েডিজম (হরমোন কম): অকারণে ওজন বাড়া, ক্লান্তি, শীত বেশি লাগা, ত্বক শুষ্ক হওয়া, চুল পড়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাসিকের অনিয়ম।
  • হাইপারথাইরয়েডিজম (হরমোন বেশি): ওজন কমে যাওয়া, বুক ধড়ফড়, হাত কাঁপা, অতিরিক্ত ঘাম, অস্থিরতা, অনিদ্রা।

বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে থাইরয়েডজনিত সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। গর্ভাবস্থা, বন্ধ্যাত্ব বা মাসিকের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে প্রায়ই প্রথমেই থাইরয়েড টেস্ট দিতে বলা হয়।

থাইরয়েড টেস্ট কি খালি পেটে করতে হয়?

TSH, FT4 ও FT3 টেস্টের জন্য সাধারণত না খেয়ে থাকা জরুরি নয়। রক্তে সুগার বা কোলেস্টেরল মাপার মতো এখানে খাবারের সরাসরি বড় প্রভাব পড়ে না। অর্থাৎ নাশতা করে গেলেও সাধারণত রিপোর্টে বড় কোনো পার্থক্য হয় না।

তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে সতর্কতা দরকার:

একসঙ্গে অন্য টেস্ট থাকলে
থাইরয়েডের সঙ্গে যদি ফাস্টিং ব্লাড সুগার, লিপিড প্রোফাইল (কোলেস্টেরল) বা লিভার ফাংশন টেস্টও করাতে বলা হয়, তাহলে ৮-১২ ঘণ্টা না খেয়ে যেতে হবে। তখন খালি পেটে যাওয়ার কারণ থাইরয়েড টেস্ট নয়, অন্য টেস্টগুলো। 

চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে বা ল্যাবের নির্দেশনায় এটি লেখা থাকে, না থাকলে জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভালো।

সকালের দিকে টেস্ট করা ভালো
TSH হরমোনের মাত্রা দিনের বিভিন্ন সময়ে একটু ওঠানামা করে। সাধারণত রাতে ও ভোরে এটি বেশি থাকে এবং বিকেলে কিছুটা কমে। তাই সকালে টেস্ট করলে ফলাফলের তুলনা সহজ হয়।

বারবার টেস্ট করালে প্রতিবার একই সময়ে করানোই ভালো।

পানি পান করা যাবে
না খেয়ে যেতে বলা হলেও পানি খাওয়া যায়। পানি খেলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং রক্ত নেওয়া সহজ হয়।

টাইফয়েড জ্বর হলে কি দুধ খাওয়া যায়?

থাইরয়েডের ওষুধ খেলে কী করবেন?

বাংলাদেশে অনেকেই হাইপোথাইরয়েডিজমের জন্য লিভোথাইরক্সিন (যেমন থাইরক্সিন নামে পরিচিত ওষুধ) খান। যারা নিয়মিত এই ওষুধ খান, তাদের জন্য নিয়মটা একটু আলাদা:

  • সাধারণত রক্ত দেওয়ার পরে সেদিনের ওষুধ খেতে বলা হয়। ওষুধ খাওয়ার পরপরই রক্ত নিলে FT4-এর মাত্রা সাময়িকভাবে বেশি দেখাতে পারে।
  • ওষুধ সাধারণত খালি পেটে, নাশতার আগে খাওয়ার নিয়ম। তাই টেস্টের দিন ওষুধ কখন খাবেন, সে ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিন।
  • নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করে টেস্ট করাবেন না।

যারা হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য কার্বিমাজল বা মিথিমাজল জাতীয় ওষুধ খান, তাদেরও নিজের ডাক্তারের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।

বায়োটিন বা বিউটি সাপ্লিমেন্ট খেলে সাবধান

চুল ও নখ ভালো রাখার জন্য অনেকে বায়োটিন (ভিটামিন বি৭) বা হেয়ার-স্কিন-নেইল সাপ্লিমেন্ট খান। বায়োটিন কিছু ল্যাবের থাইরয়েড টেস্ট পদ্ধতির সঙ্গে গোলমাল করে ভুল রিপোর্ট দিতে পারে।

তাই এই ধরনের সাপ্লিমেন্ট খেলে টেস্টের আগে ডাক্তার বা ল্যাবকে জানান। 

সাধারণত টেস্টের কয়েক দিন আগে থেকে তা বন্ধ রাখতে বলা হয়। কতদিন আগে বন্ধ করবেন, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।

টেস্টের আগে যা যা করবেন

  • ডাক্তার কোন কোন টেস্ট লিখেছেন, তা দেখে নিন। শুধু TSH, নাকি T3, T4, FT4, অ্যান্টি-টিপিও অ্যান্টিবডিসহ পুরো প্যানেল।
  • চলমান সব ওষুধ ও সাপ্লিমেন্টের তালিকা ডাক্তার ও ল্যাবকে জানান।
  • সম্ভব হলে সকালের দিকে যান এবং পরেরবারও একই সময়ে যান।
  • আয়োডিনযুক্ত কোনো সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ খেলে তা জানান।
  • গর্ভবতী হলে বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসককে বলুন, কারণ এ সময়ে থাইরয়েডের স্বাভাবিক মাত্রা আলাদা ধরা হয়।
  • অসুস্থ থাকলে (যেমন তীব্র জ্বর বা সংক্রমণ) চিকিৎসককে জানান, কারণ গুরুতর অসুস্থতা সাময়িকভাবে ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
থাইরয়েড টেস্ট কি খালি পেটে করতে হয়

থাইরয়েডের কোন কোন টেস্ট হয়?

টেস্টকী জানা যায়
TSHথাইরয়েড সক্রিয় নাকি কম বা বেশি, তা জানার প্রধান ও প্রথম টেস্ট
FT4 / T4রক্তে মূল থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ
FT3 / T3সক্রিয় হরমোনের মাত্রা, বিশেষ করে হাইপারথাইরয়েডিজমে বেশি দরকার
অ্যান্টি-টিপিও (Anti-TPO)হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিস ও অটোইমিউন সমস্যা শনাক্তে
থাইরয়েড আল্ট্রাসনোগ্রাফিগ্রন্থির আকার, গলগণ্ড বা চাকা আছে কি না

অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে কেবল TSH করেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন। ফল স্বাভাবিকের বাইরে এলে বাকি টেস্ট দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে থাইরয়েড টেস্ট কোথায় ও কত খরচে হয়?

ঢাকাসহ বিভাগীয় শহর ও অনেক জেলা শহরের প্রায় সব বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে থাইরয়েড টেস্টের সুবিধা আছে। যেমন পপুলার, ইবনে সিনা, ল্যাবএইড, স্কয়ার ও বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। 

পরমাণু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (INMAS)-এও থাইরয়েড সংক্রান্ত সেবা পাওয়া যায়।

খরচ ল্যাব, শহর ও পদ্ধতিভেদে ভিন্ন হয়। সাধারণভাবে TSH টেস্ট কয়েকশ টাকার মধ্যে, আর পুরো থাইরয়েড প্যানেলে (TSH, FT3, FT4, Anti-TPO ইত্যাদি) খরচ কিছুটা বেশি পড়ে।

সঠিক মূল্য জানতে সরাসরি ল্যাবে ফোন করে জেনে নেওয়াই ভালো।

অনেক ল্যাবে হোম কালেকশন সুবিধাও আছে, যা বয়স্ক বা কর্মব্যস্ত রোগীদের জন্য সুবিধাজনক।

একটি পরামর্শ: পরবর্তী ফলো-আপ টেস্টগুলো সম্ভব হলে একই ল্যাবে করান। ভিন্ন ল্যাবের পদ্ধতি ও রেফারেন্স রেঞ্জ আলাদা হতে পারে, তাই তুলনা করা সহজ হয়।

রিপোর্ট হাতে পেলে কী করবেন?

রিপোর্টে সাধারণত রেফারেন্স রেঞ্জ লেখা থাকে। ল্যাবভেদে এই সীমা সামান্য আলাদা হতে পারে।

শুধু সংখ্যা দেখে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন না। TSH বেশি থাকলে সাধারণত হাইপোথাইরয়েডিজমের ইঙ্গিত, কম থাকলে হাইপারথাইরয়েডিজমের ইঙ্গিত দেয়। 

কিন্তু চিকিৎসা শুরু হবে লক্ষণ, বয়স, গর্ভাবস্থা ও অন্যান্য রিপোর্ট বিবেচনা করে। এ জন্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট (হরমোন বিশেষজ্ঞ)-এর পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।

ওষুধ শুরু করার পর সাধারণত ৬-৮ সপ্তাহ পরে আবার TSH টেস্ট করা হয়, তারপর ডোজ ঠিক হলে বছরে একবার বা চিকিৎসকের পরামর্শমতো।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: থাইরয়েড টেস্টের আগে কি চা-কফি খাওয়া যাবে?
উত্তর: সাধারণত TSH টেস্টের ক্ষেত্রে সমস্যা নেই। তবে অন্য টেস্ট একসঙ্গে থাকলে ও ফাস্টিং দরকার হলে শুধু পানি ছাড়া কিছু খাবেন না।

প্রশ্ন: থাইরয়েড টেস্ট কি যেকোনো সময় করা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, যেকোনো সময় করা যায়। তবে সকালে এবং প্রতিবার একই সময়ে করা ভালো।

প্রশ্ন: থাইরয়েড টেস্টের রিপোর্ট কত সময়ে পাওয়া যায়?
উত্তর: বেশিরভাগ ল্যাবে একই দিনে বা পরদিন পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: গর্ভাবস্থায় কি থাইরয়েড টেস্ট জরুরি?
উত্তর: চিকিৎসকেরা প্রায়ই পরামর্শ দেন, কারণ মায়ের থাইরয়েড হরমোন গর্ভের শিশুর বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: ওষুধ খেয়ে টেস্ট করলে কী হবে?
উত্তর: ওষুধ খাওয়ার পরপর রক্ত দিলে বিশেষ করে FT4 সাময়িকভাবে বেশি আসতে পারে। তাই সাধারণত আগে রক্ত দিয়ে পরে ওষুধ খেতে বলা হয়।

আপনার প্রশ্ন ছিল, থাইরয়েড টেস্ট কি খালি পেটে করতে হয়? উত্তর হলো, সাধারণত না। TSH, T3, T4 টেস্ট খেয়ে বা না খেয়ে দুভাবেই করা যায়।

কিন্তু একসঙ্গে ব্লাড সুগার বা কোলেস্টেরলের মতো টেস্ট থাকলে ফাস্টিং লাগতে পারে। 

আর থাইরয়েডের ওষুধ বা বায়োটিন সাপ্লিমেন্ট খেলে সময় ও নিয়ম ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নেওয়া জরুরি।

লক্ষণ থাকলে টেস্ট পিছিয়ে দেবেন না। সময়মতো ধরা পড়লে থাইরয়েডের সমস্যা সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

বি.দ্র.: এই লেখা শুধুমাত্র তথ্যের জন্য, এটি কোনো চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।

নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্তের জন্য অবশ্যই registered চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

আরও জানুন…

রামদেবের হার্টের ব্যায়াম: সহজ যোগ ও প্রাণায়াম গাইড

ট্রাইগ্লিসারাইড কমানোর ঘরোয়া উপায়: বাংলাদেশিদের জন্য সহজ গাইড

একটি মন্তব্য লিখুন