নিজেকে কিভাবে পরিপাটি রাখা যায় জানতে চান? বাংলাদেশের আবহাওয়ায় পরিচ্ছন্ন, স্মার্ট ও আত্মবিশ্বাসী থাকার ব্যবহারিক টিপস পড়ুন।
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা দিয়ে শুরু করুন
পরিপাটি থাকার প্রথম ধাপ হলো পরিচ্ছন্নতা। সবচেয়ে দামি পোশাকও পরিচ্ছন্নতার অভাব ঢাকতে পারে না।
গোসল ও ঘামের যত্ন: আমাদের দেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় প্রতিদিন অন্তত একবার, গ্রীষ্মকালে সম্ভব হলে দুইবার গোসল করা ভালো। বাইরে থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে নিলে ঘাম ও ধুলাবালি দূর হয়।
বগল, ঘাড়, পায়ের আঙুলের ফাঁক ও কোমরের ভাঁজের মতো জায়গায় ঘাম জমে বেশি, তাই এগুলো ভালো করে পরিষ্কার করুন এবং শুকিয়ে নিন।
দাঁত ও মুখের যত্ন: দিনে দুইবার ব্রাশ করা জরুরি। জিহ্বা পরিষ্কার করার অভ্যাসও মুখের দুর্গন্ধ কমায়।
পান, জর্দা বা সুপারির অভ্যাস থাকলে দাঁতে দাগ পড়ে, তাই খাওয়ার পর কুলি করুন। বছরে একবার ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া ভালো।
চুল ও দাড়ির যত্ন: চুল নিয়মিত ধুয়ে আঁচড়ে রাখুন। ছেলেরা প্রতি তিন-চার সপ্তাহে চুল ছাঁটুন এবং দাড়ি রাখলে সেটি পরিপাটি করে ট্রিম করে রাখুন।
মেয়েরা চুলের আগা নিয়মিত ছেঁটে ফেললে চুল স্বাস্থ্যবান দেখায়।
তেল দেওয়ার অভ্যাস থাকলে অল্প ব্যবহার করুন, নইলে ধুলা জমে চুল চিটচিটে দেখায়।
নখ ও হাতের যত্ন: সপ্তাহে একবার নখ কেটে পরিষ্কার করুন। ময়লা নখ খুব সহজেই চোখে পড়ে এবং একজন মানুষের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে।
ত্বকের যত্ন: বাংলাদেশের আবহাওয়া মাথায় রেখে
আমাদের দেশে ছয় ঋতু থাকলেও গরম, বর্ষা আর শীত এই তিনটিই বেশি অনুভূত হয়। প্রতিটি সময়ের জন্য ত্বকের যত্ন আলাদা।
- গরমকালে: হালকা ফেসওয়াশ ব্যবহার করুন এবং দিনে দুই-তিনবার মুখ ধোবেন। রোদে বের হলে অবশ্যই সানস্ক্রিন লাগান, কারণ আমাদের দেশের রোদ অনেক তীব্র।
- বর্ষাকালে: আর্দ্রতার কারণে ছত্রাকের সংক্রমণ বাড়ে। পা ভিজে গেলে বাসায় ফিরে ভালো করে শুকিয়ে নিন। ভেজা মোজা বা জুতা বেশিক্ষণ পরে থাকবেন না।
- শীতকালে: ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, ঠোঁট ও পায়ের গোড়ালি ফাটে। গোসলের পর ময়েশ্চারাইজার বা ভ্যাসলিন ব্যবহার করুন এবং প্রচুর পানি পান করুন।
ত্বকের জন্য দামি প্রোডাক্ট লাগবে না। নিজের ত্বকের ধরন বুঝে একটি ফেসওয়াশ, একটি ময়েশ্চারাইজার ও একটি সানস্ক্রিন থাকলেই যথেষ্ট।
মানসিক রোগ থেকে মুক্তির ব্যায়াম: ৭টি অনুশীলন
পোশাক বাছাইয়ে বুদ্ধিমত্তা
পরিপাটি থাকতে দামি পোশাক লাগে না। পোশাক পরিষ্কার, ইস্ত্রি করা ও গায়ে ঠিকমতো মানানসই হলেই যথেষ্ট।
ফিটিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: অতি ঢিলা বা অতি টাইট পোশাক দুটোই অগোছালো দেখায়।
বঙ্গবাজার, নিউমার্কেট বা পাড়ার দর্জির কাছ থেকে সামান্য খরচে পোশাক গায়ের মাপে ঠিক করিয়ে নিলে পুরো লুক বদলে যায়।
ইস্ত্রির গুরুত্ব: কুঁচকানো শার্ট বা কামিজ যতই দামি হোক, অগোছালো দেখায়। বাসায় ইস্ত্রি না থাকলে পাড়ার লন্ড্রি থেকে করিয়ে নিন, খরচ খুবই কম।
আবহাওয়া অনুযায়ী কাপড়: গরমে সুতি, লিনেন বা খাদির মতো হালকা কাপড় পরুন। এসব কাপড় ঘাম শুষে নেয় আর শরীরে বাতাস চলতে দেয়, তাই অস্বস্তি কম হয়।
সিনথেটিক কাপড় গরমে গায়ে সেঁটে থাকে এবং ঘামের গন্ধও বেশি ধরে রাখে, তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
শীতে সোয়েটার, জ্যাকেট বা শাল ব্যবহার করুন, তবে গুছিয়ে পরুন, যাতে উষ্ণতার সঙ্গে সঙ্গে পরিপাটি ভাবটাও থাকে।
উপলক্ষ বুঝে সাজুন: অফিসে ফরমাল শার্ট-প্যান্ট বা সালোয়ার-কামিজ, জুমার নামাজে পাঞ্জাবি, ঈদ বা বিয়েতে উৎসবের পোশাক। জায়গা অনুযায়ী পোশাক বাছাই করা পরিপাটি থাকারই অংশ।
জুতা ও ব্যাগ: জুতা পরিষ্কার না থাকলে পুরো সাজ নষ্ট হয়। সপ্তাহে অন্তত একবার জুতা মুছে নিন।
বর্ষায় ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন, যাতে ভিজে অগোছালো হতে না হয়।

সুগন্ধি: কম হলেই ভালো
গরমে ঘামের গন্ধ থেকে বাঁচতে ডিওডোরেন্ট বা রোল-অন ব্যবহার করুন।
আমাদের দেশে আতর ও হালকা সুগন্ধির চল আছে, যা পাঞ্জাবির সঙ্গে চমৎকার মানায়। তবে বেশি পরিমাণে ব্যবহার করবেন না।
অতিরিক্ত সুগন্ধি আশপাশের মানুষের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তাই পরিচ্ছন্নতাকে অগ্রাধিকার দিন, সুগন্ধি হোক কেবল বাড়তি ছোঁয়া।
নিজের জিনিসপত্র ও থাকার জায়গা গুছিয়ে রাখুন
একজন পরিপাটি মানুষের পরিচয় শুধু তার চেহারায় নয়, তার চারপাশেও ফুটে ওঠে।
- ওয়ার্ডরোব গুছিয়ে রাখুন: পোশাক গুছিয়ে ভাঁজ করে বা হ্যাঙ্গারে রাখুন, সকালে তাড়াহুড়ো করে আর কিছু খুঁজতে হবে না।
- আগের রাতে প্রস্তুতি নিন: পরদিন কী পরবেন, ব্যাগে কী নেবেন তা রাতেই ঠিক করে রাখুন। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে সকালের সময় খুব মূল্যবান।
- ব্যাগ ও মানিব্যাগ পরিষ্কার রাখুন: অপ্রয়োজনীয় কাগজ, পুরোনো রশিদ আর বাজে জিনিস সরিয়ে ফেলুন।
- ঘর ও পড়ার টেবিল গোছান: মেস, হোস্টেল বা ছোট ফ্ল্যাট, যেখানেই থাকুন, প্রতিদিন পাঁচ মিনিট গুছিয়ে রাখলে ঘরের পাশাপাশি মনও থাকে পরিচ্ছন্ন।
সুস্থ থাকা মানেই পরিপাটি থাকা
শরীর অসুস্থ বা ক্লান্ত থাকলে কেউ পরিপাটি থাকতে পারে না। তাই স্বাস্থ্যের যত্নও এই তালিকার অংশ।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন: দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করলে ত্বক ও শরীর সতেজ থাকে, বিশেষ করে গরমে।
- পরিমিত ঘুম: রাত জেগে মোবাইল বা ফেসবুক ব্যবহার করলে চোখের নিচে কালি পড়ে এবং সারাদিন ক্লান্ত লাগে। ৬-৮ ঘণ্টা ঘুম শরীরের জন্য জরুরি।
- সুষম খাবার: ভাত, মাছ, ডাল, শাকসবজি ও ফল, সুষম খাবার শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। রাস্তার তেলেভাজা ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়া কমিয়ে দিন।
- হালকা ব্যায়াম: প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম শরীরকে সতেজ রাখে। সকালে বা সন্ধ্যায় পাড়ার পার্কে বা ছাদে হাঁটলেই যথেষ্ট।
আচার-আচরণ ও কথাবার্তাতেও পরিপাটি থাকুন
বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি আচরণের পরিচ্ছন্নতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
- সময়ের মূল্য দিন: কথা দিয়ে সময়মতো উপস্থিত থাকা পরিপাটি মানুষের বড় গুণ।
- ভদ্রভাবে কথা বলুন: সালাম, ধন্যবাদ আর দুঃখিত বলার অভ্যাস মানুষের মন জয় করে।
- দাঁড়ানো ও বসার ভঙ্গি: সোজা হয়ে দাঁড়ান ও বসুন। কুঁজো হয়ে থাকলে আত্মবিশ্বাসের অভাব মনে হয়।
- মোবাইলের ব্যবহার: কারও সঙ্গে কথা বলার সময় বারবার ফোনে চোখ রাখা অভদ্রতা।
বাজেট কম হলেও পরিপাটি থাকা সম্ভব
পরিপাটি থাকতে যে বেশি খরচ করতে হয়, তা নয়। এর জন্য আলাদা বাজেটেরও দরকার নেই।
কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ:
- কম সংখ্যক কিন্তু ভালো মানের পোশাক কিনুন। অনেক সস্তা কাপড়ের চেয়ে কয়েকটি টেকসই পোশাক ভালো।
- সাদা, নীল, কালো, ধূসরের মতো নিরপেক্ষ রঙের পোশাক রাখুন, যেগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি মিলিয়ে পরা যায়।
- ঈদ বা মৌসুমি সেলের সময় প্রয়োজনীয় জিনিস কিনুন।
- জুতা ও ব্যাগ মেরামত করে ব্যবহার করুন। পাড়ার মুচি বা দর্জির কাছে সামান্য খরচে অনেক কিছু ঠিক হয়ে যায়।
প্রতিদিনের সহজ রুটিন
শুরু করতে সমস্যা হলে নিচের রুটিনটি অনুসরণ করতে পারেন:
সকালে: ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করুন, গোসল সারুন, ইস্ত্রি করা পোশাক পরুন, চুল আঁচড়ান এবং হালকা ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন লাগান।
দিনে: সঙ্গে ছোট রুমাল বা টিস্যু রাখুন। দুপুরে মুখ ধুয়ে নিন, আর নিয়মিত পানি পান করুন।
রাতে: বাসায় ফিরে গোসল বা হাত-মুখ ধুয়ে নিন, ব্রাশ করুন, পরদিনের পোশাক ঠিক করে রাখুন এবং সময়মতো ঘুমাতে যান।
পরিপাটি থাকা কোনো একদিনের কাজ নয়, এটি একটি অভ্যাস। আজ থেকেই ছোট ছোট পরিবর্তন শুরু করুন, যেমন নিয়মিত গোসল, পরিষ্কার ইস্ত্রি করা পোশাক, গোছানো ব্যাগ আর ভদ্র আচরণ।
কিছুদিনের মধ্যেই দেখবেন, আপনার আত্মবিশ্বাস বেড়েছে এবং মানুষ আপনাকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে।
মনে রাখবেন, নিজেকে কিভাবে পরিপাটি রাখা যায়, এর উত্তর কোনো জটিল সূত্রে নেই।
এর উত্তর আছে প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তে। নিজেকে যত্ন করলে অন্যরাও আপনাকে সম্মান করবে, আর সবচেয়ে বড় কথা, আপনি নিজেই নিজের ভেতরে ভালো থাকবেন।
আরও জানুন…
