কান ফুটো পেকে গেলে কি করনীয়? জেনে নিন কারণ, লক্ষণ, ঘরোয়া পরিচর্যা, কী করবেন না এবং কখন ডাক্তার দেখাবেন, সম্পূর্ণ গাইড।
বাংলাদেশে মেয়েদের (এবং এখন অনেক ছেলের) কান ফোটানো খুবই সাধারণ ব্যাপার। শিশুর বয়স কয়েক মাস হতে না হতেই অনেক পরিবারে কান ফোটানো হয়। কিন্তু কান ফোটানোর কিছুদিন পর অনেকেরই কানের ফুটো লাল হয়ে ফুলে যায়, ব্যথা করে, এমনকি পুঁজ বের হয়।
সাধারণ ভাষায় একে বলে কান ফুটো পেকে যাওয়া। অনেকে ভয় পেয়ে ভুল চিকিৎসা করেন, ফলে সমস্যা আরও বাড়ে। এই লেখায় জানবেন কান ফুটো পেকে গেলে কি করনীয়, কোন ভুলগুলো এড়াবেন এবং কখন দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাবেন।
কান ফুটো পেকে যাওয়া বলতে কী বোঝায়?
কান ফোটানোর পর ফুটোটি আসলে একটি ছোট ক্ষত। এই ক্ষতে জীবাণু (সাধারণত ব্যাকটেরিয়া) ঢুকে সংক্রমণ ঘটালে ফুটোর চারপাশ লাল হয়, ফুলে যায়, ব্যথা হয় এবং হলদে বা সাদাটে পুঁজ জমে। একেই আমরা কান পেকে যাওয়া বলি।
কানের নরম অংশ (লতি) ফোটানোর পর সাধারণত ৬ থেকে ৮ সপ্তাহে পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। কানের ওপরের শক্ত অংশে, অর্থাৎ তরুণাস্থিতে (cartilage) ফোটালে সুস্থ হতে ৩ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত লাগতে পারে। এই সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি থাকে।
কান ফুটো পেকে যাওয়ার প্রধান কারণ
বাংলাদেশের বাস্তবতায় কয়েকটি কারণ বেশি দেখা যায়:
- অপরিষ্কার যন্ত্র বা অদক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে কান ফোটানো। গ্রামগঞ্জে বা পাড়ার গয়নার দোকানে অনেক সময় জীবাণুমুক্ত না করা সুই বা যন্ত্র দিয়ে কান ফোঁড়া হয়। এটাই সংক্রমণের সবচেয়ে বড় কারণ।
- নোংরা হাতে ফুটো ধরা। বারবার হাত দিয়ে কান নাড়াচাড়া করলে হাতের জীবাণু ফুটোতে ঢোকে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটা খুব বেশি হয়।
- নিম্নমানের গহনা। সস্তা নকল ধাতু বা নিকেল মেশানো দুল পরলে অ্যালার্জি হয়, যা থেকে লালচে ভাব, চুলকানি ও পরে সংক্রমণ হতে পারে। খাঁটি সোনা, রুপা বা সার্জিক্যাল স্টিলের গহনা তুলনামূলক নিরাপদ।
- গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া। আমাদের দেশে বছরের বেশিরভাগ সময় গরম ও ভ্যাপসা থাকে। ঘাম ও ময়লা জমে ব্যাকটেরিয়া বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
- পরিচর্যার অভাব। ফোটানোর পর ফুটো পরিষ্কার না রাখা, অথবা বেশি ঘষামাজা করা।
- সুই বা দুল খুব আঁটসাঁট হওয়া। এতে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং ক্ষত সারতে দেরি হয়।
- শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা। ডায়াবেটিস থাকলে বা শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম হলে সংক্রমণ সহজে হয় এবং দেরিতে সারে।
সাগর কলা খেলে কি কৃমি হয়? জেনে নিন সত্যটা
কান পেকে যাওয়ার লক্ষণ
নিচের লক্ষণগুলো দেখলে বুঝবেন সংক্রমণ হয়েছে:
- ফুটোর চারপাশ লাল ও ফোলা
- ছুঁলে বা চাপ দিলে ব্যথা
- ফুটো থেকে হলদে, সবুজাভ বা সাদা পুঁজ বের হওয়া
- কান গরম অনুভব হওয়া
- চুলকানি বা জ্বালাপোড়া
- ফুটো থেকে দুর্গন্ধ
- গুরুতর ক্ষেত্রে জ্বর, কানের চারপাশ ফুলে যাওয়া

কান ফুটো পেকে গেলে করণীয় (ধাপে ধাপে)
১: হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিন
কান ছোঁয়ার আগে সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুয়ে নিন। পরিষ্কার তোয়ালে বা টিস্যুতে হাত মুছুন।
২: দুল খুলবেন না (প্রাথমিক অবস্থায়)
অনেকেই ভয়ে দুল খুলে ফেলেন। কিন্তু সংক্রমিত অবস্থায় দুল খুলে ফেললে ফুটোর মুখ বন্ধ হয়ে ভেতরে পুঁজ আটকে যেতে পারে, যা ফোড়া বা অ্যাবসেস তৈরি করতে পারে। তাই সাধারণত দুল জায়গায় রেখেই পরিষ্কার করা ভালো।
তবে দুল যদি খুব আঁটসাঁট হয়, ত্বকের ভেতরে বসে যায় বা ধাতুতে অ্যালার্জি সন্দেহ হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৩: স্যালাইন পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন
ঘরেই পরিষ্কার স্যালাইন তৈরি করা যায়: এক কাপ (প্রায় ২৫০ মিলি) ফোটানো ও ঠান্ডা করা পানিতে সিকি চা-চামচ লবণ মেশান। পরিষ্কার তুলা বা গজ এই পানিতে ভিজিয়ে দিনে ২ থেকে ৩ বার আলতো করে ফুটোর সামনে ও পেছনে মুছুন।
ফার্মেসিতে পাওয়া নরমাল স্যালাইনও ব্যবহার করা যায়। প্রতিবার নতুন তুলা নিন।
৪: কুসুম গরম সেঁক দিন
পরিষ্কার নরম কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে দিনে ২ থেকে ৩ বার ৫ থেকে ১০ মিনিট হালকা সেঁক দিন। এতে ব্যথা ও ফোলা কমে এবং পুঁজ বের হতে সাহায্য হয়। পানি যেন বেশি গরম না হয়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।
৫: ফার্মাসিস্ট বা ডাক্তারের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক মলম
হালকা সংক্রমণে চিকিৎসকেরা অনেক সময় মুপিরোসিন বা ফিউসিডিক অ্যাসিডজাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক মলম লাগাতে বলেন। তবে নিজে নিজে ওষুধ বেছে নেওয়ার চেয়ে ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক নিজে নিজে কখনোই শুরু করবেন না।
৬: ফুটো শুকনো রাখুন
গোসলের পর নরম পরিষ্কার কাপড় বা টিস্যু দিয়ে হালকা চেপে কান শুকিয়ে নিন। ঘষবেন না।
৭: কান ঢেকে বা চেপে ঘুমানো এড়ান
সংক্রমিত কানের ওপর চাপ দিয়ে ঘুমালে ব্যথা ও ফোলা বাড়ে। উল্টো দিকে কাত হয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। বালিশের কভার নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।
কান পাকলে যা করবেন না
বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু ঘরোয়া অভ্যাস সংক্রমণ বাড়িয়ে দিতে পারে:
- পুঁজ নিজে চেপে বের করার চেষ্টা করবেন না। এতে জীবাণু আরও গভীরে ছড়াতে পারে।
- সরিষার তেল, নারকেল তেল, হলুদ বা অন্য কোনো ঘরোয়া উপাদান ফুটোতে লাগাবেন না। এগুলো ফুটো আটকে দিতে পারে এবং অপরিষ্কার হলে নতুন জীবাণু ঢোকাতে পারে।
- স্পিরিট, ডেটল, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড বা অ্যালকোহল দিয়ে বারবার ধোবেন না। এগুলো ত্বকের সুস্থ কোষ নষ্ট করে এবং সারতে দেরি করায়।
- নোংরা হাতে কান ধরবেন না এবং বারবার দুল ঘোরাবেন না।
- একই দুল সংক্রমিত অবস্থায় অন্যের সঙ্গে ব্যবহার করবেন না।
- নিজে নিজে সুই বা পিন দিয়ে ফুটো খোঁচাবেন না।
কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান:
- ২ থেকে ৩ দিনের ঘরোয়া পরিচর্যায় কোনো উন্নতি না হলে
- লালচে ভাব ও ফোলা কানের বড় অংশে ছড়িয়ে পড়লে
- জ্বর, কাঁপুনি বা শরীরে ব্যথা হলে
- অনেক পুঁজ বা দুর্গন্ধ থাকলে
- কানের ওপরের শক্ত অংশে (তরুণাস্থিতে) সংক্রমণ হলে। এটা তুলনামূলক গুরুতর এবং কানের আকৃতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
- দুল ত্বকের ভেতর বসে গেলে
- রোগীর ডায়াবেটিস বা অন্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে
- ছোট শিশুর কান পাকলে
- ফুটোর জায়গায় শক্ত গুটি বা ফোড়ার মতো তৈরি হলে
সংক্রমিত কানের ক্ষত যদি মরিচাধরা বা নোংরা কিছু দিয়ে হয়ে থাকে এবং আপনার টিটেনাসের টিকা নেওয়া না থাকে বা অনেক আগে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ডাক্তারকে জানান।
কোথায় যাবেন: প্রথমে এলাকার এমবিবিএস চিকিৎসক বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখাতে পারেন। জটিল হলে জেলা সদর হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা (ENT) বিভাগে যান।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভাগীয় শহরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ইএনটি বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায়।
কান ফুটো পেকে যাওয়া প্রতিরোধের উপায়
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সবসময় ভালো। কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমে:
- কান ফোটানোর জায়গা বেছে নিন সচেতনভাবে। পরিচিত ও পরিচ্ছন্ন ক্লিনিক, হাসপাতাল বা প্রশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে যান। ব্যবহৃত যন্ত্র যেন জীবাণুমুক্ত হয়, এবং একবার ব্যবহারযোগ্য (ডিসপোজেবল) সুই বা স্টেরাইল পিয়ার্সিং কিট ব্যবহার করা হয়।
- সঠিক সময় বেছে নিন। খুব গরম ও আর্দ্র সময়ে বা শিশুর অসুস্থতার সময় কান ফোটানো এড়ানো ভালো। শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
- মানসম্মত গহনা ব্যবহার করুন। প্রথম দিকে খাঁটি সোনা, সার্জিক্যাল স্টিল বা টাইটানিয়ামের স্টাড বেছে নিন। সস্তা কৃত্রিম গহনা এড়ান।
- নিয়মিত পরিচর্যা করুন। প্রথম ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ দিনে ১ থেকে ২ বার স্যালাইন দিয়ে পরিষ্কার করুন।
- হাত পরিষ্কার না করে কান ছোঁবেন না।
- চুল, শ্যাম্পু ও প্রসাধনী থেকে কান দূরে রাখুন। শ্যাম্পু বা সাবান লেগে গেলে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ফেলুন।
- ঘুমানোর সময় ও খেলাধুলার সময় সতর্ক থাকুন। দুল টান লেগে ছিঁড়ে যাওয়া বা ক্ষত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষ করে শিশুদের।
- ফুটো সম্পূর্ণ শুকানোর আগে দুল খুলে রাখবেন না এবং বারবার বদলাবেন না।
শিশুদের কান পাকলে বাড়তি সতর্কতা
শিশুরা নিজের কান বারবার ধরে বা টানে, তাই তাদের কানে সংক্রমণ বেশি হয়। শিশুর কান পাকলে:
- তার হাত পরিষ্কার ও নখ ছোট রাখুন
- দুল ছোট, হালকা ও নিরাপদ রাখুন, যেন গিলে ফেলার ঝুঁকি না থাকে
- ঘরোয়া পরিচর্যায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় উন্নতি না হলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা ইএনটি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান
- জ্বর থাকলে বা শিশু খুব খিটখিটে হয়ে গেলে দেরি করবেন না
সুস্থ হতে কতদিন লাগে?
হালকা সংক্রমণ সঠিক পরিচর্যায় সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিনে ভালো হতে শুরু করে। তবে ফুটো পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। তরুণাস্থির সংক্রমণে বেশি সময় লাগে এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান দরকার হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১: কান ফুটো পেকে গেলে কি দুল খুলে ফেলা উচিত?
সাধারণত না। দুল খুলে ফেললে ফুটো বন্ধ হয়ে ভেতরে পুঁজ আটকে যেতে পারে। তবে দুল ত্বকে বসে গেলে বা অ্যালার্জি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে খুলতে হবে।
২: কান পাকলে কি ঘরোয়া উপায়ে ভালো হয়?
হালকা সংক্রমণ স্যালাইন দিয়ে পরিষ্কার ও গরম সেঁকে ভালো হতে পারে। কিন্তু ২ থেকে ৩ দিনে উন্নতি না হলে বা লক্ষণ বাড়লে ডাক্তার দেখান।
৩: কান পাকলে কোন মলম লাগাব?
ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক মলম ব্যবহার করা যায়। নিজে নিজে যেকোনো ওষুধ ব্যবহার না করাই ভালো।
৪: কানে তেল বা হলুদ লাগানো কি ঠিক?
না। এতে ফুটো আটকে যেতে পারে এবং নতুন করে সংক্রমণ হতে পারে।
৫: কান পাকলে জ্বর হলে কী করব?
জ্বর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
কান ফুটো পেকে যাওয়া সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে গুরুতর রূপ নিতে পারে। কান পাকলে প্রথমেই হাত পরিষ্কার করুন, স্যালাইন দিয়ে আলতো করে ধুয়ে দিন এবং কুসুম গরম সেঁক দিন।
তেল, হলুদ, স্পিরিট বা চেপে পুঁজ বের করার মতো ভুল এড়িয়ে চলুন। উন্নতি না হলে, জ্বর এলে বা কানের শক্ত অংশে সংক্রমণ হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কান ফোটানোর সময় পরিচ্ছন্ন জায়গা ও মানসম্মত গহনা বেছে নিলে এবং নিয়মিত যত্ন নিলে এই সমস্যা সহজেই এড়ানো সম্ভব।
সতর্কতা: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি কোনো চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। সমস্যা গুরুতর হলে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
আরও জানুন…
