চোখে শশা দিলে কি হয়? জেনে নিন উপকারিতা, ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা, সঙ্গে কালো দাগ নিয়ে সত্যি কথা।
পার্লারের ছবিতে বা সিনেমায় আমরা প্রায়ই দেখি, কেউ চোখের ওপর দুই টুকরো শশা রেখে শুয়ে আছেন। প্রশ্ন হলো, চোখে শশা দিলে কি হয়? এটা কি সত্যিই কাজ করে, নাকি শুধুই প্রচলিত বিশ্বাস?
এই লেখায় সহজ ভাষায় জানবেন শশা চোখে দিলে কী কী সুবিধা পাওয়া যায়, কোন কোন দাবি অতিরঞ্জিত, কীভাবে ব্যবহার করবেন এবং কী কী সতর্কতা মানা জরুরি।
শশা কেন চোখের যত্নে ব্যবহার করা হয়?
আমাদের দেশে সারা বছরই শশা সহজে পাওয়া যায়, বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় দামও কম থাকে। এর প্রায় ৯৫ শতাংশই পানি। এছাড়া এতে সামান্য পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, পটাশিয়াম এবং কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান থাকে।
শশা ফ্রিজে ঠান্ডা করে কেটে চোখের ওপর রাখলে ত্বকে একটা শীতল অনুভূতি আসে।
এই ঠান্ডা ভাব ও পানির উপস্থিতিই এর জনপ্রিয়তার মূল কারণ। তবে এটি কোনো ওষুধ নয়, তাই এর কাছ থেকে অলৌকিক ফল আশা করা ঠিক নয়।

চোখে শশা দিলে কী কী উপকার পাওয়া যায়?
চোখ ও আশপাশের ত্বকে আরাম
ঢাকা, চট্টগ্রাম বা রাজশাহীর তীব্র গরমে বাইরে থেকে ফিরলে চোখ জ্বালা করে, ক্লান্ত লাগে।
ঠান্ডা শশার টুকরো চোখের পাতায় রাখলে সাময়িকভাবে আরাম পাওয়া যায়।
এই আরাম মূলত ঠান্ডা সেঁকের কারণে, যা যেকোনো ঠান্ডা কাপড় বা বরফ-শীতল পানিতে ভেজানো তুলাতেও পাওয়া যায়।
চোখ ফুলে যাওয়া কিছুটা কমতে পারে
ঘুম কম হলে বা অনেক রাত জাগলে সকালে চোখের নিচে ফোলাভাব দেখা যায়।
ঠান্ডা প্রয়োগে ত্বকের ছোট রক্তনালি সাময়িকভাবে সংকুচিত হয়, ফলে ফোলাভাব কিছুটা কমে। এর প্রভাব স্থায়ী নয়, কয়েক ঘণ্টা পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।
ত্বকে সাময়িক আর্দ্রতা
শশায় পানির পরিমাণ বেশি, তাই চোখের চারপাশের পাতলা ও শুষ্ক ত্বকে সাময়িক সতেজ ভাব আসে।
শীতকালে যাদের ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, তারা এতে কিছুটা আরাম পেতে পারেন। তবে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজারের বিকল্প এটি নয়।
মানসিক প্রশান্তি
অফিস, ক্লাস বা কাজের চাপের পর পাঁচ-দশ মিনিট চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা নিজেই একধরনের বিশ্রাম।
শশার ঠান্ডা অনুভূতি এই বিশ্রামকে আরও আরামদায়ক করে তোলে। এটিকে একটি ছোট রিল্যাক্সেশন রুটিন হিসেবে ভাবতে পারেন।
ডিপ্রেশনের ওষুধ কতদিন খেতে হয়? জেনে নিন
চোখের নিচের কালো দাগ কি শশায় দূর হয়?
এটাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত দাবি, আর এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা আছে। চোখের নিচে কালো দাগ হওয়ার কারণ অনেক:
- বংশগত বা জিনগত কারণ
- দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
- রক্তস্বল্পতা (বাংলাদেশে নারী ও কিশোরীদের মধ্যে এটি বেশ সাধারণ)
- অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার
- অ্যালার্জি বা সাইনাসের সমস্যা
- রোদে পোড়া ও ত্বকের পিগমেন্টেশন
- বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া
শশা এই কারণগুলোর কোনোটিই মূল থেকে সারাতে পারে না। এটি বড়জোর ত্বককে সাময়িকভাবে সতেজ দেখাতে পারে। যদি কালো দাগের পেছনে রক্তস্বল্পতা বা অন্য শারীরিক সমস্যা থাকে, তাহলে শশা ঘষে বা রেখে সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সঠিকভাবে চোখে শশা ব্যবহারের নিয়ম
ঠিকভাবে ব্যবহার না করলে উপকারের বদলে সমস্যা হতে পারে। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।
- ভালো শশা বাছাই করুন। বাজার থেকে তাজা, শক্ত ও দাগহীন শশা কিনুন। নরম বা পচা অংশ থাকলে তা ব্যবহার করবেন না।
- ভালোভাবে ধুয়ে নিন। বাংলাদেশের অনেক বাজারেই সবজি খোলা অবস্থায় বিক্রি হয়, ফলে ধুলাবালি ও জীবাণু লেগে থাকতে পারে। প্রবাহিত পরিষ্কার পানিতে ভালো করে ধুয়ে নিন। সম্ভব হলে ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানি ব্যবহার করুন।
- হাত পরিষ্কার রাখুন। সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে তারপর শশা কাটুন। ছুরি ও কাটিং বোর্ডও পরিষ্কার হওয়া চাই।
- পাতলা গোল টুকরো কাটুন। আধা সেন্টিমিটারের মতো পুরু দুটি টুকরো যথেষ্ট। খোসা ছাড়াতে পারেন, আবার না ছাড়ালেও চলে, তবে ভালোভাবে ধোয়া থাকতে হবে।
- ফ্রিজে ১০-১৫ মিনিট ঠান্ডা করুন। বরফের মতো জমাট করার দরকার নেই, শুধু শীতল হলেই হবে।
- চোখ বন্ধ করে ১০-১৫ মিনিট রাখুন। শুয়ে বা হেলান দিয়ে বসে চোখের পাতার ওপর আলতো করে রাখুন। চোখের ভেতরে রস যেন না ঢোকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- ব্যবহারের পর পরিষ্কার পানিতে মুখ ধুয়ে ফেলুন। একবার ব্যবহার করা টুকরো আবার ব্যবহার করবেন না।
সপ্তাহে তিন-চারদিন ব্যবহার করলেই যথেষ্ট। প্রতিদিন একাধিকবার ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।
কখন সতর্ক থাকবেন?
প্রাকৃতিক জিনিস মানেই সবার জন্য নিরাপদ, এমন নয়। কিছু বিষয় মাথায় রাখুন:
- অ্যালার্জি: কারও শশায় অ্যালার্জি থাকলে চোখে লালচে ভাব, চুলকানি বা ফোলা দেখা দিতে পারে। প্রথমবার ব্যবহারের আগে হাতের ত্বকের ছোট একটি জায়গায় পরীক্ষা করে নিন।
- চোখের সংক্রমণ: চোখ লাল, পানি পড়া বা পিচুটি থাকলে শশা ব্যবহার করবেন না। অপরিষ্কার শশা সংক্রমণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
- কনট্যাক্ট লেন্স: লেন্স পরা অবস্থায় শশা রাখবেন না। আগে লেন্স খুলে নিন।
- চোখের ভেতরে রস ঢোকানো: শশার রস বা পেস্ট সরাসরি চোখের ভেতরে দেওয়া উচিত নয়। এতে জ্বালা বা ক্ষতি হতে পারে।
- ঘরোয়া টোটকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা: দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া, ব্যথা, ঘন ঘন মাথাব্যথা বা চোখ শুকিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে ঘরোয়া উপায়ে সময় নষ্ট করবেন না।
শশার পাশাপাশি চোখের যত্নে আর যা করবেন
শুধু শশা দিয়ে চোখ ভালো রাখা সম্ভব নয়। আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসই চোখের স্বাস্থ্যে বড় ভূমিকা রাখে।
- স্ক্রিন টাইম কমান। ২০-২০-২০ নিয়মটি মেনে চলুন: প্রতি ২০ মিনিট পরপর ২০ ফুট দূরের কিছুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকান। এতে চোখের চাপ কমে।
- পর্যাপ্ত ঘুমান। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম দরকার। লোডশেডিং, গরম বা রাত জেগে কাজের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত হলেও যতটা সম্ভব নিয়মিত ঘুমের চেষ্টা করুন।
- পুষ্টিকর খাবার খান। গাজর, মিষ্টি কুমড়া, পালংশাক, লাল শাক, ডিম ও মাছ চোখের জন্য উপকারী। এগুলো বাংলাদেশে সহজলভ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
- রোদে বের হলে সানগ্লাস পরুন। তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি চোখ ও চোখের চারপাশের ত্বকের ক্ষতি করে। ভালো মানের ইউভি-প্রটেকশন সানগ্লাস ব্যবহার করুন।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন। শরীরে পানির ঘাটতি হলে চোখ শুকনো লাগে ও চোখের নিচে ক্লান্ত ভাব দেখা দেয়।
- ধুলাবালি ও দূষণ থেকে সুরক্ষা। শহরের ধুলা ও ধোঁয়া চোখের জন্য ক্ষতিকর। বাইরে থেকে ফিরে পরিষ্কার পানিতে চোখ ও মুখ ধুয়ে নিন।
- নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করান। বছরে অন্তত একবার চক্ষু বিশেষজ্ঞকে দেখান, বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা পারিবারিক চোখের রোগের ইতিহাস থাকলে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে চক্ষু চিকিৎসক বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান:
- কয়েক সপ্তাহ ধরে চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ থাকা
- হঠাৎ করে একটি চোখ বেশি ফুলে যাওয়া
- চোখে ব্যথা, লালভাব বা অতিরিক্ত পানি পড়া
- দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা ঝাপসা দেখা
- মাথাব্যথার সঙ্গে চোখে চাপ অনুভব করা
ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে এসব সমস্যার চিকিৎসা পাওয়া যায়। জেলা পর্যায়েও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রাথমিক পরামর্শ নেওয়া সম্ভব।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: প্রতিদিন চোখে শশা দেওয়া কি নিরাপদ?
উত্তর: পরিষ্কার শশা ব্যবহার করলে এবং অ্যালার্জি না থাকলে সাধারণত ক্ষতি নেই। তবে প্রতিদিন নয়, সপ্তাহে কয়েকবার ব্যবহার করাই যথেষ্ট।
প্রশ্ন: শশা চোখে দিলে কি চশমার পাওয়ার কমে?
উত্তর: না। চশমার পাওয়ার বা দৃষ্টিশক্তির সমস্যার সঙ্গে শশার কোনো প্রমাণিত সম্পর্ক নেই। এসব সমস্যায় চক্ষু চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রশ্ন: শশার বদলে আর কী ব্যবহার করা যায়?
উত্তর: ঠান্ডা পানিতে ভেজানো পরিষ্কার কাপড়, ঠান্ডা করা গ্রিন টি ব্যাগ বা ঠান্ডা চামচও একই ধরনের আরাম দিতে পারে।
প্রশ্ন: শশার খোসা কি চোখে দেওয়া যায়?
উত্তর: দেওয়া যায়, তবে খোসায় ময়লা বা কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে। তাই খুব ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া জরুরি। নিশ্চিত না হলে খোসা ছাড়িয়ে নেওয়াই ভালো।
প্রশ্ন: কত সময় চোখে শশা রাখা উচিত?
উত্তর: ১০ থেকে ১৫ মিনিট যথেষ্ট। এর বেশি সময় রাখলে বিশেষ কোনো বাড়তি লাভ নেই।
তাহলে চোখে শশা দিলে কি হয়? সংক্ষেপে বলা যায়, এতে চোখ ও আশপাশের ত্বকে সাময়িক ঠান্ডা আরাম পাওয়া যায়, ফোলাভাব কিছুটা কমতে পারে এবং মন শান্ত হয়।
তবে চোখের নিচের স্থায়ী কালো দাগ দূর করা, দৃষ্টিশক্তি বাড়ানো বা চোখের রোগ সারানোর ক্ষমতা শশার নেই।
শশা একটি সহজলভ্য, কম খরচের ঘরোয়া উপায়, যা গরমের দিনে বা দীর্ঘ স্ক্রিন টাইমের পর চোখকে একটু বিশ্রাম দিতে পারে। এটিকে পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করুন, চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়।
বি.দ্র.: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। চোখে কোনো সমস্যা থাকলে অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আরও জানুন…
