মাথা যন্ত্রণা কমানোর আকুপ্রেসার কীভাবে করবেন? ঘরে বসে হাত, ঘাড় ও কপালের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চাপ দেওয়ার সহজ নিয়ম জানুন।
সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ঢাকার যানজট, দুপুরে প্রচণ্ড গরম আর রাতে মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিন। এই তিনটির যেকোনো একটিই মাথা ব্যথা শুরু করার জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশে অনেকেই মাথা ধরলে প্রথমেই ফার্মেসি থেকে ব্যথার ওষুধ কিনে খেয়ে ফেলেন।
কিন্তু বারবার ওষুধ খাওয়া ভালো অভ্যাস নয়। এ কারণে অনেকে ওষুধ ছাড়া সহজ কিছু উপায় খোঁজেন। তার একটি হলো মাথা যন্ত্রণা কমানোর আকুপ্রেসার।
এই লেখায় জানবেন আকুপ্রেসার কী, কোন কোন পয়েন্টে চাপ দিলে মাথা ব্যথায় আরাম পেতে পারেন, কীভাবে করবেন এবং কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন।
মাথা ব্যথা কেন হয়?
আকুপ্রেসারে যাওয়ার আগে কারণগুলো জানা ভালো। আমাদের দেশে সাধারণত যে কারণগুলো দেখা যায়:
- টেনশন ও মানসিক চাপ: কাজের চাপ, পরীক্ষার চিন্তা বা সংসারের দুশ্চিন্তায় ঘাড় ও কপালের পেশি শক্ত হয়ে যায়। একে টেনশন টাইপ হেডেক বলে। এটিই সবচেয়ে প্রচলিত ধরন।
- পানিশূন্যতা: গরমের সময় ঘামের কারণে শরীরে পানি কমে গেলে মাথা ধরে। রোজার সময়ও অনেকের এমন হয়।
- দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার: মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে একটানা তাকিয়ে থাকলে চোখের পেশির ওপর চাপ পড়ে। ফ্রিল্যান্সার, অফিসকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ কারণে কপাল ও চোখের আশপাশে ব্যথা হওয়া খুবই সাধারণ।
- ঘুমের অভিযোগ ও অনিয়মিত খাবার: রাত জাগা বা বেশিক্ষণ না খেয়ে থাকলেও মাথা ব্যথা হয়।
- যানজট, শব্দদূষণ ও ধুলাবালি: শহরের পরিবেশ অনেকের মাইগ্রেন বা মাথা ব্যথাকে উসকে দেয়।
- সাইনাসের সমস্যা: ঋতু পরিবর্তনের সময় সর্দি-সাইনাসের কারণে কপাল ও চোখের আশপাশে ব্যথা হয়।

আকুপ্রেসার কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
আকুপ্রেসার একটি প্রাচীন পদ্ধতি। এতে শরীরের নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে আঙুল বা বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দেওয়া হয়। এতে কোনো সুই বা ওষুধ লাগে না। প্রচলিত ধারণা হলো, এই পয়েন্টগুলোতে চাপ দিলে পেশির টান কমে, রক্তসঞ্চালন ভালো হয় এবং শরীর শিথিল হয়।
বিশেষ করে টেনশনজনিত মাথা ব্যথায় অনেকেই এতে আরাম পান বলে জানান।
তবে মনে রাখা দরকার, আকুপ্রেসার চিকিৎসার বিকল্প নয়। এটি একটি সহায়ক ও আরামদায়ক পদ্ধতি। এর কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা এখনো সীমিত।
শুরুর আগে যে নিয়মগুলো মানবেন
- শান্ত ও আরামদায়ক জায়গায় বসুন বা শুয়ে পড়ুন।
- হাত ধুয়ে নিন এবং নখ ছোট রাখুন।
- হালকা থেকে মাঝারি চাপ দিন। এমন জোরে চাপ দেবেন না যাতে ব্যথা পান।
- প্রতিটি পয়েন্টে ধীরে গভীর শ্বাস নিতে নিতে ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট চাপ দিন।
- চাপ দেওয়ার সময় আঙুল সামান্য গোল করে ঘোরাতে পারেন।
খাবারে অরুচি কোন রোগের লক্ষণ? কারণ ও চিকিৎসা
মাথা যন্ত্রণা কমানোর আকুপ্রেসারের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট
হ্যাগু পয়েন্ট (হাতের বুড়ো ও তর্জনীর মাঝখানে)
মাথা ব্যথায় আকুপ্রেসারের সবচেয়ে জনপ্রিয় পয়েন্টগুলোর একটি এটি। এক হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর মাঝখানে যে মাংসল অংশ আছে, সেখানে অন্য হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দিন। চাপ এমন হবে যাতে আরাম লাগে কিন্তু ব্যথা না লাগে।
এভাবে প্রায় ১ মিনিট ধরে রাখুন, এরপর অন্য হাতে একইভাবে করুন।
সতর্কতা: গর্ভবতী নারীদের এই পয়েন্টে চাপ দেওয়া উচিত নয়।
ফেংচি পয়েন্ট (ঘাড়ের পেছনে, মাথার খুলির নিচে)
মাথার পেছনের খুলির নিচে ঘাড়ের দুই পাশে দুটি গর্তের মতো জায়গা আছে। দুই হাতের বুড়ো আঙুল সেখানে রেখে মাথাটি সামান্য পেছনে হেলিয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে চাপ দিন। ঘাড় ও কাঁধ শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে মাথা ব্যথা হলে এই পয়েন্টে সাধারণত বেশি আরাম মেলে।
ইনটাং পয়েন্ট (দুই ভুরুর মাঝখানে)
দুই ভুরুর ঠিক মাঝখানে, কপালের যেখানে নাকের গোড়া শুরু হয়, সেখানে তর্জনী বা মধ্যমা আঙুল দিয়ে হালকা চাপ দিন। চোখ বন্ধ করে ধীরে শ্বাস নিন। সাইনাস বা চোখের ক্লান্তিজনিত ব্যথায় এটি কাজে লাগতে পারে।
তাইয়াং পয়েন্ট (রগের দুই পাশে)
কপালের দুই পাশে, চোখের কোণ থেকে একটু পেছনে যে নরম জায়গা (রগ) আছে, সেটিই তাইয়াং পয়েন্ট। দুই হাতের আঙুলের ডগা দিয়ে হালকা চাপ দিন এবং ছোট গোল করে ঘোরান। মাইগ্রেন বা একপাশের মাথা ব্যথায় অনেকে এখানে আরাম পান। চাপ অবশ্যই হালকা রাখবেন।
তাইচং পয়েন্ট (পায়ের পাতার ওপরে)
পায়ের বুড়ো আঙুল ও পরের আঙুলের মাঝখান থেকে পায়ের পাতার ওপর দিকে দুই-তিন আঙুল পরিমাণ উঠলে একটি খাঁজ পাওয়া যায়। সেখানে বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দিন। মানসিক চাপ ও রাগজনিত মাথা ব্যথায় এটি সহায়ক বলে মনে করা হয়।
আকুপ্রেসারের সঙ্গে যে অভ্যাসগুলো মাথা ব্যথা কমাতে সাহায্য করে
শুধু আকুপ্রেসার নয়, জীবনযাত্রায় ছোট কিছু পরিবর্তনও দরকার:
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন: দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি খান। গরমে ঘাম বেশি হলে খাবার স্যালাইন বা লেবুর শরবত পান করা যায়।
- নিয়মিত খাবার খান: সকালের নাস্তা বাদ দিলে বা অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে মাথা ব্যথা হতে পারে। তাই সময়মতো খেয়ে নিন।
- স্ক্রিনের বিরতি নিন: প্রতি ২০ মিনিট পরপর ২০ ফুট দূরের কিছুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন।
- ঘুমের রুটিন ঠিক রাখুন: প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
- ঘাড়ের ব্যায়াম ও হালকা হাঁটা: ঘাড় ও কাঁধ ধীরে ঘুরিয়ে পেশির টান কমান, আর সকাল বা সন্ধ্যায় ১৫ মিনিট হাঁটুন।
- কপালে ঠান্ডা বা গরম সেঁক: টেনশনের মাথা ব্যথায় অনেকে এতে আরাম পান।
- কোলাহল ও উজ্জ্বল আলো এড়িয়ে চলুন: মাথা ধরলে কিছুক্ষণ অন্ধকার ও নীরব ঘরে বিশ্রাম নিন।
কখন আকুপ্রেসার নয়, ডাক্তার দেখাতে হবে?
সব মাথা ব্যথা সাধারণ নয়। নিচের লক্ষণ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
ঢাকায় বিএসএমএমইউ বা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে নিউরোলজি বিভাগ আছে, আর জেলা পর্যায়ে সদর হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে পারেন।
- হঠাৎ তীব্র মাথা ব্যথা: এমন অসহ্য ব্যথা, যা আগে কখনো হয়নি এবং হঠাৎ শুরু হয়েছে।
- মাথায় আঘাত পাওয়ার পর ব্যথা
- জ্বর, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা র্যাশের সঙ্গে মাথা ব্যথা
- মাথা বা শরীরে ব্যথার সঙ্গে চোখে ঝাপসা দেখা, কথা অস্পষ্ট বা জড়িয়ে যাওয়া, হাত-পায়ে জোর কমে যাওয়া, অথবা খিঁচুনি হওয়া।
- বারবার বমি হওয়া
- ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিন মাথা ব্যথা বা ব্যথা ক্রমেই বাড়তে থাকা
- ৫০ বছরের পর নতুন করে মাথা ব্যথা শুরু হওয়া
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, গর্ভাবস্থা বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে আকুপ্রেসার করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: আকুপ্রেসার করলে কতক্ষণে মাথা ব্যথা কমে?
উত্তর: একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। অনেকে ৫-১০ মিনিটের মধ্যে আরাম অনুভব করেন, আবার কারও ক্ষেত্রে বেশি সময় লাগে। টেনশনের ব্যথায় সাধারণত ভালো সাড়া পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: দিনে কতবার আকুপ্রেসার করা যায়?
উত্তর: দিনে ২-৩ বার, প্রতিবার ৫-১০ মিনিট করা যায়। অতিরিক্ত বা খুব জোরে চাপ দেবেন না।
প্রশ্ন: মাইগ্রেনের ব্যথায় কি আকুপ্রেসার কাজ করে?
উত্তর: কেউ কেউ এতে কিছুটা আরাম পান, কিন্তু এটি মাইগ্রেনের চিকিৎসার বিকল্প নয়। মাইগ্রেন ঘন ঘন হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করান।
প্রশ্ন: শিশুদের মাথা ব্যথায় কি আকুপ্রেসার করা যাবে?
উত্তর: শিশুদের ক্ষেত্রে নিজে থেকে কিছু করার আগে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রশ্ন: আকুপ্রেসার শেখার জন্য কি প্রশিক্ষণ দরকার?
উত্তর: সাধারণ কয়েকটি পয়েন্টে হালকা চাপ দেওয়া ঘরে নিজেই করা যায়। তবে বিস্তারিত চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া ভালো।
মাথা ব্যথা প্রায় সবার জীবনেই আসে, আর বাংলাদেশের ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ জীবনে এটি আরও বেশি দেখা যায়। মাথা যন্ত্রণা কমানোর আকুপ্রেসার একটি সহজ, খরচহীন ও ঝুঁকিহীন পদ্ধতি, যা টেনশন ও পেশির টান থেকে হওয়া মাথা ব্যথায় আরাম দিতে পারে।
হ্যাগু, ফেংচি, ইনটাং, তাইয়াং ও তাইচং পয়েন্টে নিয়ম মেনে চাপ দিন, সঙ্গে পানি পান, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্ক্রিন থেকে বিরতির অভ্যাস গড়ে তুলুন।
তবে মাথা ব্যথা যদি বারবার হয়, অসহনীয় হয় বা উপরের বিপদ-সংকেতগুলোর কোনোটি থাকে, তাহলে আকুপ্রেসারের ওপর ভরসা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি কোনো চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।
আরও জানুন…
